Responsive image

বর্জ্যের বিনিময়ে গাছ ও আকর্ষণীয় সেবা দিচ্ছে `ফিল্টার’

নিজস্ব প্রতিবেদক, বিনিয়োগবার্তা: বাংলাদেশে বর্জ্যের সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে প্রতিনিয়তই দূষিত হচ্ছে পরিবেশ। বিশ্বের অন্যতম জনবহুল শহর ঢাকা শহর। ঢাকা শহরে জনসংখ্যার ঘনত্ব যেমন বেশি তেমনি ব্যবহারের পর ফেলে দেওয়া বর্জ্য পদার্থের পরিমাণ টাও বেশি। কিন্তু এগুলার কোনো স্থায়ী সমাধান বা রিসাইকেল করার তেমন ভালো প্লাটফর্ম নেই।

গবেষণা অনুযায়ী, শুধু ঢাকা শহরেই একজন মানুষ দৈনিক গড়ে ০.৫ কেজি বর্জ্য উৎপাদন করে। দুই সিটি কর্পোরেশন মিলিয়ে সেই বর্জ্যের পরিমাণ প্রতিদিন প্রায় ৬ হাজার ২’শ ৫০ টন।  কিন্তু এত পরিমাণ বর্জ্যের জন্য নেই কোনো স্থায়ী সমাধান। যার ফলে প্রতিনিয়তই দূষিত হচ্ছে পরিবেশ। এটি মারাত্মক আকার ধারন করেছে পচনশীল ও অপচনশীল বর্জ্য একসাথে মিশে যাবার কারনে। পচনশীল বর্জ্য পরিবেশের সাথে মিশে গেলেও অপচনশীল বর্জ্যের কারনে তৈরি হচ্ছে নতুন মাত্রার দূষন।

বর্জ্য সমস্যা সমাধানে দারুণ এক উদ্ভাবনী চিন্তা নিয়ে কাজ করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ বিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের দুই শিক্ষার্থী মোঃ আবু মুছা শুভ,তাওফির আহমেদ সিয়াম এবং নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাদভি মাহমুদ।

ফিল্টার (FILTER) নামে একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আধুনিক বর্জ্য সমস্যার সমাধান নিয়ে কাজ করছে এই তিন তরুণ।

২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে খুলনাতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ শুরু করলেও চলতি বছরের জানুয়ারি মাস থেকে ঢাকাতে কাজ করছে “ফিল্টার”। ফিল্টারের মাধ্যমে কেউ চাইলে তাদের বর্জ্য দিয়ে বিনিময়ে পরিবেশ বান্ধব গাছ, ছাদ বাগানের সরঞ্জাম, মোবাইল রিচার্জ, ব্যাংকে মানি ট্রান্সফার, নগদ ক্যাশ এবং আপ কামিং ফিল্টারের ওয়েবসাইট থেকে যেকোনো পণ্য কিনলেই ফ্রি ডেলিভারির সুবিধা নিতে পারবে।

ঢাকা শহরে প্রতিনিয়তই কমছে সবুজের পরিমাণ। বড় বড় নির্মাণ যতই বাড়ছে গাছপালার পরিমাণ যেন ততই কমে যাচ্ছে দিনের পর দিন। সেই ব্যাপার মাথায় রেখেই বর্জ্য সংগ্রহ করে বিনিময়ে মানুষের হাতে গাছের চারা সহ অন্যান্য সুবিধা গুলো পৌছে দিচ্ছে এই উদ্যোগী তরুণরা।

ফিল্টারের লক্ষ্য ঢাকা শহর সহ সারাদেশে বর্জ্য সমস্যার স্থায়ী এবং পরিবেশ বান্ধব সমাধান দেয়া, নগর অঞ্চলসহ সারাদেশে সবুজের হার বাড়ানো এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও প্রযুক্তির মাধ্যমে বর্জ্য শিল্পকে আধুনিকায়ন করা। তারা বর্জ্যগুলো কে দুই ভাগে ভাগ করে দিয়েছে, পচনশীল এবং অপচনশীল । যেগুলো অপচনশীল সেগুলোকে রিসাইক্লিং এর মাধ্যমে পুনরায় ব্যবহারযোগ্য করে পরিবেশ রক্ষা করে আসছে এই প্রতিষ্ঠানটি।

ফিল্টারের প্রতিনিধি মোঃ আবু মুছা শুভ বলেন, “বর্জ্য অব্যবস্থাপনার জন্য সব থেকে বেশি দায়ী বর্জ্যের যথাযথ মূল্য বুঝতে না পারা। অপরিকল্পিত ও অবৈজ্ঞানিক collection system এবং পর্যন্ত জনসচেতনতার অভাব এ সমস্যার মূল কারন।” তিনি আরো জানান ভোক্তা, পরিবেশ ও সরকার এই তিন উপাদানের মধ্যে পরিবেশবান্ধব পারস্পারিক মিথস্ক্রিয়া ও সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সুনির্দিষ্ট কাঠামো নিয়ে আমাদের FILTER।

তাওফির আহমেদ সিয়াম বলেন, “আমরা Source Separation নিশ্চিত করতে চাই। ল্যান্ডফিলে যদি অপচনশীল বর্জ্য না ফেলা হয় তাহলে পরিবেশকে রক্ষা করা যাবে। বর্জ্য সম্পদে পরিনত করলে যেখানে সেখানে বর্জ্য পড়ে থাকবে না এতে দূষনের মাত্রা কমবে ও জলাবদ্ধতা সহ অনেক বিপর্যয়ের সমাধান হবে।”  তার মতে ল্যান্ডফিলে বর্জ্য না পুড়িয়ে সেগুলো শক্তিতে রূপান্তর করা সম্ভব।

তিনি আরো বলেন, “আমরা চাইলেই আমাদের সবার বাড়িতে ফলজ, বনজ ও ঔষধি গাছ রাখতে পারি, এতে শহরের বায়ু দূষনের মাত্রা কমবে এবং সবুজায়নের হার বাড়বে।”

বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, কাটাবন, পলাশী, নিউমার্কেট,এলিফ্যান্ট রোড, হাতিরপুল, সেন্ট্রাল রোড, গ্রীনরোড, সাইন্সল্যাব, ঝিগাতলা এরিয়াতে কাজ করছে ফিল্টার। তারা বর্তমানে বাসা-বাড়ি, দোকান, রেস্টুরেন্টে এবং বিভিন্ন অফিসের ও প্রতিষ্ঠানের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করছে।

ভবিষ্যতে ফিল্টার মোবাইল এপ্লিকেশনের মাধ্যমে আধুনিক উপায়ে সেবা পৌছে দিতে চায় মানুষের দোরগোড়ায়। মানুষের বাসায় দুই জাতীয় ওয়েস্ট বিন দেওয়ার ও পরিকল্পনা রয়েছে। যেন মানুষ দৈনিক ব্যবহার করার পর তৈরি হওয়া পচনশীল এবং অপচনশীল বর্জ্য দুটো আলাদা বিনে জমা করে রাখতে পারে।

সাক্ষাৎকারে নাদভি মাহমুদ বলেন, “আমরা বর্জ্য শিল্পকে অনেকদূর নিয়ে যেতে চাই। আমাদের ওয়েবসাইটের মাধ্যমে সেবাগ্রহনকারী বর্জ্য সংগ্রহের সময়, বর্জ্য সংগ্রহের জন্য অনুরোধ, প্রাপ্তমূল্য এবং প্রাপ্ত মূল্যের বিনিময়ে পছন্দমত গাছ ও নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিতে পারবেন। আমরা পরিবেশের উন্নয়নের কথা ভেবেই এ প্রতিষ্ঠানের ডিজাইন করেছি।”

স্বপ্নবাজ এই তিন তরুণের উদ্ভাবনী উদ্যোগে ইতোমধ্যেই সাড়া দিয়েছে ঢাকা শহরের সাধারণ জনগন। তারা সকলেই এখন নিজেদের বর্জ্য ফিল্টারকে দিয়ে বিনিময়ে গাছ, বাগানের সরঞ্জাম, নগদ টাকাসহ বুঝে নিচ্ছেন নানাবিধ সুবিধা। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সাথে সাথে এ ধরনের পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি।

(টিএএস/এসএএম/১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১)

 

Short URL: https://biniyougbarta.com/?p=137544

সর্বশেষ খবর