Responsive image

রমজানের অর্থনীতি, মূল্য ব্যবস্থাপনা ও বাজার মনিটরিং প্রসঙ্গ

ড: মিহির কুমার রায়: রমজান মাস পবিত্র, বরকতময়, সংযম ও ধৈর্যের বার্তাবাহী একাট গুরুত্বপূর্ণ মাস। এ মাস সিয়াম সাধনার মাস, আত্মশুদ্ধির মাস। ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা পুরো বছরজুড়ে অধীর আগ্রহে এ মাসটির জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। এ বছর এমন একটি সময়ে একইসাথে পহেলা বৈশাখ ও মাহে রমজান ১৪ এপ্রিল থেকে শুরু হয়েছে, যখন করোনার দ্বিতীয় ঢেউ দেশের মানুষের জীবন জীবিকাকে বিপদগ্রস্থ করে তুলছে। যেখানে মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ১১ হাজারের উপরে চলে এসেছে। প্রাণঘাতি করোনার দ্বিতীয় প্রবাহ মোকাবেলায় আবারো দেশে চলছে লকডাউন; যা কবে শেষ হবে তা অনিশ্চিত। আর এটি অনেক ক্ষেত্রে নির্ভর করছে সংক্রামকের গতিপ্রকৃতির উপর, যদিও সরকার ৫ই মে পর্যন্ত তা বর্ধিত করেছে। লকডাউনের কারণে স্থানীয় সরবরাহ ব্যবস্থাও কিছুটা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে যা সব মিলিয়ে অভ্যন্তরীণ বাজার আরো অস্থির হওয়ার আশঙ্কা বিধায় সামনের দিনে পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ ও বাজার স্থিতিশীল রাখাই মূল চ্যালেঞ্জ।

রমজানের ফজিলতের কথা কম-বেশি আমরা সবাই জানি। কিন্তু বাস্তবতা হলো দেশের অধিকাংশ ব্যবসায়ী বেশি মুনাফা অর্জনের আশায় এ  সময়ের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। কোন পণ্য রমজান মাসে বেশি ব্যবহার হবে, রোজাদাররা কোন পণ্যটি দাম বাড়লেও কিনতে চাইবে কিংবা তারা রোজার অনেক আগে থেকেই খাদ্যদ্রব্য গুদামজাত করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে ইত্যাদি। আবার অন্যদিকে দেখা যায়, রমজান মাসটা যেন খাদ্যোৎসবের মাস যেখানে রোজাদাররা বেশি বেশি খাবারের আয়োজনে ব্যস্ত থাকে। দাম যতই বাড়ুক না কেন, বেশি দাম দিয়ে হলেও তা কিনতে হবে। ইফতার বা সেহরিতে পর্যাপ্ত পরিমাণে খাবার না-থাকলে রোজা যেন পূর্ণতা পায় না। কেউ কেউ রমজান মাসের কথা চিন্তা করে আগে থেকেই প্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্য ঘরে মজুদ করতে থাকে। ঈদ সামনে রেখে শুরু হয় কেনাকাটার ধুম, রমজানের প্রকৃত ফজিলত নিয়ে তেমনভাবে ভাবনার বিষয়টি কম দেখা যায়। নিম্ন আয়ের মানুষ এ বছরের মাসটিতে কীভাবে রোজা রাখবে বা উচ্চমূল্য দিয়ে দ্রব্যাদি কিনে কীভাবে তাদের দৈনন্দিন জীবন নির্বাহ করবে-এটি নিয়ে দেশের অধিকাংশ বিত্তশালীদের কম ভাবতে দেখা যায়। বিশেষত, চলতি বছরটি লকডাউনের কারণে নানা শ্রেণী-পেশার সাধারণ মানুষের আয় কমেছে। বিশেষকরে দিনমজুরের আয় বলতে গেলে বন্ধ। তথা রমজানের এ সময়ে বেশির ভাগ নিত্যপণ্যের দামে তাদের ভোগান্তি বেড়েছে।

অর্থনীতি গবেষণা সংস্থা সানেম বলছে, দেশে দারিদ্র্যের সার্বিক হার বেড়েছে যা গত নভেম্বর-ডিসেম্বরে পরিচালিত জরিপ থেকে পাওয়া তাদের হিসাবে দেশে দারিদ্র্যের হার ৪২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এক বছর আগের চেয়ে দারিদ্র্য পরিস্থিতি প্রায় দ্বিগুণ দেখা যাচ্ছে জরিপে যা এটা নিঃসন্দেহে মহামারির আঘাত। রমজান এলে এ দেশের মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে এক ধরনের প্রস্তুতি তৈরি হয়, তারা এ পবিত্র মাসে আধ্যাত্মিকভাবে পুণ্য অর্জনের জন্য প্রস্তুতি নেন, আবার কেউ প্রস্তুতি নেন সেহরি-ইফতার নানা পরিকল্পনায় উদ্যাপনের জন্য। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে খ্রিষ্টান, হিন্দু,বৌদ্ধসহ সব সম্প্রদায়ের ব্যবসায়ী যেখানে সাধারণ ক্রেতার কাছে বিশেষ ছাড় দিয়ে দ্রব্যমূল্য কমিয়ে ধর্মীয় পর্বের উপহার নিয়ে আসেন, সেখানে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা রমজানে ভোগ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিযোগিতায় নামেন- যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। যেমন: বাংলাদেশে রমজান মাস শুরু হওয়ার আগেই বাড়তে থাকে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য; যা করোনার মাসে ইতিমধ্যেই পণ্যবাজারে প্রত্যক্ষ হচ্ছে।

কেজি প্রতি চালের দাম বেড়েছে পাঁচ-সাত টাকা, ডাল ১০-২০ টাকা, ডিম হালি প্রতি পাঁচ টাকা, পেঁয়াজ ও রসুনের দাম কেজি প্রতি ৫-১০ টাকা, সয়াবিন তেল ১৫-২০ টাকা, ছোলা কেজি প্রতি ১০-২০ টাকা, মাছ কেজি প্রতি ৩০-৫০ টাকা, মুরগি ২০-৫০ টাকা, গরুর মাংসও ক্ষেত্রবিশেষে ২০-৫০ টাকা। এছাড়া কাঁচাবাজারের ক্ষেত্রেও ৫-১০ টাকা বেড়েছে। অথচ, মাসখানেক আগেও দাম সহনীয় পর্যায়ে ছিল। নিম্নমুখী আয়ের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে নিত্য-নৈমিত্তিক ক্রয়ক্ষমতার ওপর যেখানে দাম স্থিতিশীলও থাকলেও সাধারণ মানুষের জন্য তা বহন করা অসম্ভব হয়ে পড়ছে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, রোজার মাসে কেন জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে? উত্তরে বলা হবে যে, চাহিদা বাড়ছে তাই জোগান স্বল্পতায় ভারসাম্য আনতে গিয়ে দাম বাড়ানো হচ্ছে। আদৌ কি তাই? পণ্যগুলো কী পরিমাণ লাগবে এগুলো কি আমাদের অজানা? কোন কোন দ্রব্য কী পরিমাণে দরকার তা জানা থাকলে, কেন পণ্যের জোগান স্বল্পতা দেখা যায়? কেন দাম হু-হু করে বেড়ে যায়? নাকি কৃত্রিমভাবে সংকট তৈরি করে জোগান স্বল্পতার দোহাই দিচ্ছি আমরা?

চাহিদা অনুযায়ী বাজারে সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারলে পূর্ণমাত্রায় ভারসাম্য বজায় থাকবে। শুধু পর্যাপ্ত জোগান নিশ্চিত করলেই হবে না, সব পেশার মানুষের ক্রয়ক্ষমতার উপর লক্ষ্য রেখে সরকারকে পণ্যের ন্যায্য মূল্য ঠিক করে দিতে হবে। সংবিধান মতে ভোক্তাসাধারণের জন্য দাম সহনীয় রাখার দায়িত্ব রাষ্ট্রের যার  জন্য প্রয়োজন ক্রমাগত বাজার ব্যব¯থাপনা ও বাজার মনিটরিং। তারমধ্যেও ব্যতিক্রমও আছে। যেমন: একজন ব্যবসায়ী বলছেন দোকান খোলা রাখা হয়েছে লাবের জন্য নয় ,কেবল বেঁচে থাকার জন্য, কর্মচারীদের বেতন ও দোকানের ভাড়া পরিশোধের জন্য- যা জীবনের এক চমৎকার শিক্ষা বলে বিবেচিত।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উদ্যোগে ১৯৭২ সালের ১ জানুয়ারি ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) প্রতিষ্ঠিত হয়। স্বাধীনতা-উত্তরকালে বিপর্যস্ত অর্থনীতি, বিচ্ছিন্ন যোগাযোগ ব্যবস্থা, অবিন্যস্ত বন্দর ইত্যাদি প্রেক্ষাপটে পর্যাপ্ত নিত্যপণ্য ও শিল্পের কাঁচামাল জরুরি ভিত্তিতে জোগান দেওয়া এবং ন্যায্যমূল্যে নিত্যপণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা অত্যাবশ্যকীয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আশির দশকে মুক্তবাজার অর্থনীতি বিকাশের পরিপ্রেক্ষিতে রাষ্ট্রীয় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা সীমিত হয়ে আসে যা পরবর্তী সময়ে মুক্তবাজার অর্থনীতিতে সরকারি-বেসরকারি খাতের মধ্যে সমন্বয় জোরদারে সরকারি উদ্যোগের অপরিহার্যতা বিবেচনা করে বর্তমান সরকার টিসিবিকে গতিশীল ও শক্তিশালী করার পদক্ষেপ নেয়। সংকটকালে ভোক্তাদের কাছে নিত্যপণ্য সরবরাহে বিকল্প বাজার সৃষ্টিতে টিসিবি প্রতিষ্ঠা করা হলেও জনবান্ধব, সরকারি কর্মকর্তানির্ভর ও ভোক্তাদের প্রতিনিধিত্বহীন হওয়ার কারণে এ অতিগুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণে সফল হয়নি। তবে বর্তমানে করোনাকালে বাড়ছে ই-কমার্সের চাহিদা এবং এখন থেকে অনলাইনেও নিত্যপণ্য। যেমন: ভোজ্য তেল, ছোলা, চিনি এবং মসুর ডাল বিক্রি করছে সরকারের বিপণন সংস্থা ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)। মাহে রমযানে ঘরে বসে স্বস্তির বাজার কার্যক্রমের আওতায় শুরু হওয়া এ পণ্য বিক্রি চলবে আগামী ৬ মে পর্যন্ত।

ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ই-ক্যাব) ডিজিটাল হাট ডট নেট এর ৮টি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ন্যায্য মূল্যে এ সব পণ্য বিক্রয় শুরু করছে। টিসিবি ট্রাক সেলের মাধ্যমে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ন্যায্যমূল্যে দেশব্যাপী বিক্রি করছে বিশেষত স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য। মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ যাতে এ সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হয়, সেজন্য সরকার ই-কমার্সের সহযোগিতায় ভোজ্য তেল, ছোলা, চিনি এবং ডাল বিক্রির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশনের  ঘোষনা মতে এখন থেে প্রতি লিটার ভোজ্য তেল ১০৮ টাকা এবং চিনি, ছোলা, ডাল ৫৮ টাকা কেজি দরে বিক্রয় করা হচ্ছে, একজন ক্রেতা সপ্তাহে ৫ লিটার তেল এবং ৩ কেজি করে চিনি, ছোলা, ডাল ক্রয়ের সুযোগ পাবেন। ডেলিভারি খরচ ঢাকা শহরে সর্বোচ্চ ৩০ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৪০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

বাজার গবেষকবৃন্দ বলছেন, নিয়ন্ত্রণহীন বাজারে একটি বিষয় সব সময় লক্ষ করা যায় যেমন  যখন খুচরা ব্যবসায়ীকে প্রশ্ন করা হয় এ পণ্যের দাম বেশি কেন? তার তাৎক্ষণিক উত্তর হবে পাইকারি বাজারে দাম বেশি বলে। কিন্তু একই বাজারে যখন খুচরা বিক্রির তিন দোকানে তিন রকম দাম দেখা যায়, তখন মনে প্রশ্ন জাগে যা গবেষককে  ভাবিয়ে তুলে এর কারন কি? এর মানে হচ্ছে, বাজার মনিটরিং বলতে কিছু নেই। বিশ্বব্যাংকের তথ্য বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারে চাল, চিনি থেকে শুরু করে ভোজ্যতেল—খাদ্য ও কৃষি খাতের সব ধরনের পণ্যের দাম বাড়ছে। একই পরিস্থিতি অপরিশোধিত জ্বালানি তেল, কয়লাসহ প্রায় সব ধরনের জ্বালানি পণ্যের ক্ষেত্রে। এমনকি কৃষির অপরিহার্য উপকরণ সারের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। বিশ্ববাজারে ঊর্ধ্বমুখী মূল্য মানেই এসব পণ্য বাড়তি দামেই কিনতে হবে বংলাদেশকে। মানুষের জীবনধারণ, কৃষি, অবকাঠামো, শিল্পসহ পুরো অর্থনীতিতে এর প্রভাব অনেক। আন্তর্জাতিক বাজারের অত্যধিক নির্ভরতায় বারবারই দামজনিত অভিঘাতের সম্মুখীন হতে হয়, যার একটা দীর্ঘস্থায়ী সমাধান জরুরি।সেক্ষেত্রে দেশে নিত্যপণ্য থেকে শুরু করে অন্য গুরুত্বপূর্ণ পণ্যগুলোর অভ্যন্তরীণ উৎপাদন কীভাবে বাড়ানো যায় তার দিকে নজর নিতে হবে।

বিশেষত: করোনাকালে এর প্রয়োজনীয়তা আরো বেশি অনুভূত হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীও কৃষিপণ্যের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়ানোর বিষয়টি বারবার জোর দিচ্ছেন, যা বিবেচনায় নিয়ে কৃষি দফতরকে বিশেষ সক্রিয় হতে হবে। ইহা সত্য যে, অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়লেও বাজারে পণ্যের দাম সহনীয়  না-ও থাকতে পারে। যেমন: মুক্তবাজার অর্থনীতিতে পণ্যের দাম নির্ভর করে নির্বিঘ্ন ও পর্যাপ্ত সরবরাহের ওপর। দেশে ফড়িয়া, মধ্যস্বত্বভোগী ও অসাধু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট করে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরির ঘটনা প্রায়ই ঘটে। যার ফলে পর্যাপ্ত জোগান থাকলেও দাম বেড়ে যায়। তাই বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হলে খাদ্যপণ্যের সরকারি মজুদ বৃদ্ধি ও সিন্ডিকেটের কারসাজির দিকেও কড়া দৃষ্টি রাখতে হবে। বাজারে চালাতে হবে নিয়মিত অভিযান, দায়ীদের চিহ্নিত করে নিশ্চিত করতে হবে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে বাজারে রাষ্ট্রের কার্যকর নজরদারি প্রতিষ্ঠা করতেই হবে।

লেখক: গবেষক, অর্থনীতিবীদ ও সিন্ডিকেট সদস্য, সিটি ইউনিভার্সিটি, ঢাকা।

(এমআর, এসএএম/০১ মে ২০২১)

Short URL: https://biniyougbarta.com/?p=143704

সর্বশেষ খবর