সর্বশেষ সংবাদ:
Responsive image

বাংলাদেশের পাট শিল্পের নতুন সম্ভাবনা

বাংলাদেশের পাট শিল্পের নতুন সম্ভাবনা
ইসমাত জেরিন খান

বাংলাদেশের মাটি পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো মানের পাট উৎপাদনের জন্য উপযুক্ত। এ বিষয়টি মাথায় রেখে ১৯৬৪-১৯৬৯ এই পাঁচ বছরের মাথায় পশ্চিম পাকিাস্তানের একদল ব্যবসায়ী বাংলাদেশের প্রায় ৭৭টি জুট মিল স্থাপন করেন। তৎকালীন সময়ে বাংলাদেশের  রফতানী আয়ের ক্ষেত্রে জুট খাতে প্রায় ৮০ ভাগ এই সেক্টর থেকে অবদান রেখে আসছিলো। কিন্তু দেখা গেলো, পশ্চিম পাকিস্তানের এই খাতে বেসরকারী উদ্যোক্তারা তাদের আয়ের একটি বৃহৎ অংশ এদেশে কোন বিনিয়োগ না করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাচ্ছে। পরবর্তীতে এ বিষয়টি বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে বাঙ্গালীর চেতনায় একটি বড় অংশ হিসেবে চলে আসে। দেখা গেছে ৮০’র দশকে এসে সারা বিশ্বের মত বাংলাদেশেও পলিথিন পাটের বাজারের একটি বড় অংশ দখল করে নেয়। বিশেষ করে পলিথিন হালকা ও দামে সস্তা হওয়ার কারণে পর্যায়ক্রমে জুট ইন্ডাস্ট্রি প্রতিযোগী মূল্যে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে থমকে দাড়ায়। এর পরেই এ শিল্প আস্তে আস্তে রুগ্ন খাতের দিকে ধাবিত হতে থাকে।

উল্লেখ করা যেতে পারে, স্বাধীনতা পরবর্তী সরকারগুলো এই রুগ্ন ও স্থবির শিল্প খাত উন্নয়ন, উত্তরণ, উজ্জীবনের ক্ষেত্রে বিশেষ উদ্যোগ নিতে ব্যর্থ হয়েছে।  যেহেতু এই শিল্পটি তৈরি হওয়ার সময় মূলত ট্রেডিশনাল প্যাকেজিং বা ছালার বস্তা বা এশিয়ান কাপড় তৈরি করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ব্যবহার করার কারণে সীমিত সংখ্যক পণ্যই শুধুমাত্র উৎপাদন করার সক্ষমতা ছিল।  যেখানে ভারত এই শিল্পে নতুন বাজার ও ক্ষেত্র সম্প্রসারনের  জন্য ৯০ দশকে এসে ট্রেডিশনাল প্রোডাক্টের পাশাপাশি বিভিন্ন নতুন কনকজ্যুমার গ্রুপকে ফোকাস করে নতুন নতুন কনজ্যুমার প্রোডাক্ট উৎপাদনের জন্য অন্য ট্রেডিশনাল মেশিনের পরিবর্তে মর্ডান এবং আপগ্রেড টেকনোলজি দিয়ে টেক্সটাইল মেশিন ব্যবহার করে।  তাদের উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য একটি জোরালো পদক্ষেপ গ্রহণ করে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তী সরকারগুলো কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করে নাই।

বিশেষ করে এই শিল্পকে যুগোপযোগী করার ক্ষেত্রে সরকারগুলো যথেষ্ট উদাসীন থাকার কারণে বেসরকারী উদ্যোগও সেভাবে এগিয়ে আসেনি। এইক্ষেত্রে শুধুমাত্র  কিছুসংখ্যক বেসরকারী উদ্যোক্তার উদ্যোগে ৯০ দশকে এসে বেশকিছু স্পিনিং মিল্স স্থাপিত হয়। যার পরিপ্রেক্ষিতে স্থরিব হওয়া এই শিল্প কিছুটা গতি সঞ্চার হয় এবং এই খাত কিছুটা হলেও এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখে। এক্ষেত্রে এই স্পিনিং মিলগুলো মূলত কাঁচা মাল সরবরাহকারী হিসেবে নিজেদের জায়গা করে নেয়ার চেষ্টা করে। সেখানে ভারতের জুট মিলগুলো বিভিন্ন ধরনের কনজ্যুমারের ফিনিস্ড প্রোডাক্ট উৎপাদন রফতানীর ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দিয়েছে।

বিশেষ করে গত দুই বছরের মধ্যে প্রাচ্যের অস্থিশিল রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণ ছিল উল্লেখযোগ্য। কার্পেট ইন্ড্রাষ্ট্রি স্থবির হওয়ার কারনসহ আমেরিকার মন্দা অর্থনীতির কারনে কার্পেট ইন্ডাস্ট্রিও ধীরে ধীরে স্থবির হয়ে যায়। এর কারণে স্পিনিং মিলগুলো দু’বছর যাবত লোকসান দিয়ে আসছে। যেখানে সারা বিশ্ব বাজার এখন গ্রীন প্রোডাক্ট, ইকো ফ্রেন্ডলি প্রোডাক্ট, ন্যাচারাল প্রোডাক্টের দিকে ঝুঁকছে। অর্থাৎ হোম টেক্সটাইল, হাউজহোল্ড প্রোডাক্ট, প্যাকেজিং প্রোডাক্ট, লাইফ স্টাইল প্রোডাক্ট, ফ্লোর কাভারিং, গার্ডেনিং ও এগ্রিকালচার প্রোডাক্টসহ বিভিন্ন ধরনের নান্দনিক প্রোডাক্ট উৎপাদনে ভারত, চায়না, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনামসহ অন্যান্যরা পাটের সূতা ও ফেব্রিক্স ব্যবহার করে উৎপাদন করে কনজ্যুমার মার্কেটে পৌঁছে দেয়। যেখানে আমরা এখনও ৫০ বছরের পুরনো মেশিন দিয়ে ট্রেডিশনাল প্রোডাক্ট উৎপাদন ও বাজারজাত করার স্বপ্ন দেখছি। শুধুমাত্র কাঁচামাল রফতানি করার স্বপ্ন দেখছে অনেকেই; যা এ খাতকে পিছিয়ে দেয়ার অন্যতম কারণ। অর্থাৎ জুট যুগের সাথে তাল মিলিয়ে যে সমস্ত সম্ভাবনাময় খাতে পাটকে ব্যবহার করার সুযোগ ছিল, আমরা সে খাতগুলোকে ব্যবহার করার বাস্তবমুখী কোন পদক্ষেপ নেইনি। রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ব্যর্থতাই এই শিল্পকে আজ অবহেলিত শিল্পের দিকে নিয়ে গেছে।
বর্তমান সরকারই এ খাতকে এগিয়ে নেয়ার জন্য ইতোমধ্যে বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। যদিও দীর্ঘদিন স্থবির হওয়া এ শিল্পকে গতিশীল করার ক্ষেত্র যথেষ্ট নয়। একটি উদাহরণ দিয়ে বলা যায়, আমরা যদি এই মুহুর্তে শুধুমাত্র কাঁচা পাট রফতানি করি তাহলে প্রতিটনে প্রায় ৬শ’ ডলার আয় করা সম্ভব। আর শুধুমাত্র যদি সূতা রফতানি করা হয় তাহলে ১০০০ থেকে ১২০০ ডলার আয় করা সম্ভব। আর যদি ট্রেডিশনাল জুট প্রোডাক্ট রফতানি করা হয় তাহলে প্রতিটনে ১৪০০ থেকে ১৮০০ ডলার আয় হতে পারে। কিন্তু আমরা যদি ভ্যালু এ্যাডেট জুট প্রোডাক্ট উৎপাদন ও রপ্তানি করার সুযোগ পাই তাহলে প্রতিটনে ৩০০০ থেকে ১০০০০ ডলার আয় করা সম্ভব। আমরা এখনও লো ভ্যালু এ্যাডেট প্রোডাক্ট রপ্তানি করে আসছি। অর্থাৎ আমাদের প্রফিট মার্জিন খুবই কম। যে কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে যে কোন সংকট বা সমস্যা সৃষ্টি হলে এ শিল্প থমকে যায়। এক্ষেত্রে জুট খাতের একটি বড় অংশ উন্নত প্রযুক্তির আওতায় ভ্যালু এ্যাডেট প্রোডাক্ট উৎপাদন ও রপ্তানি করার সক্ষমতা নিশ্চিত করতে পারলে এ খাতের চেহারা পাল্টে যাবে।

মনে রাখতে হবে পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো মানের পাট আমাদের দেশেই আছে। আমাদের যা নেই তা হচ্ছে বলিষ্ঠ স্বপ্ন ও সঠিক রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। সরকার যদি একটি সহায়ক বিনিয়োগ ও নীতিমালা নিশ্চিত করতে পারে তাহলে এ খাতে এগিয়ে যাওয়ার নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে। অনেক দেরিতে হলেও বাংলাদেশ সরকার প্যাকেজিং এ্যাক্ট বাস্তবায়নে যে জোরালো পদক্ষেপ নিয়েছে তা যুগান্তকারী। এ শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে এই আইনটি অনেক আগেই বাস্তবায়ন হওয়ার দরকার ছিল। এর আগে এই আইন পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত বাস্তবায়ন করেছে। অর্থাৎ স্থানীয় বাজার সম্প্রসারণের মাধ্যমে এই শিল্প যে কোন প্রতিকূল অবস্থা অতিক্রম করতে সাহায্য করে। আমরা সরকারের এই পদক্ষেপকে সাধুবাদ জানাই।

জুট খাতের ভবিষ্যত নির্ভর করছে বহুমুখী পাটপণ্য উৎপাদন ও রপ্তানি সম্ভাবনার উপর। এক্ষেত্রে সরকারকে একটি দীর্ঘমেয়াদী সমন্বিত নীতিমালা তৈরি ও বাস্তবায়নের দিকে গুরুত্ব দেয়া উচিত। যা এ খাতের রপ্তানি আয় বাড়ানো ও লক্ষ লক্ষ লোকের কর্মসংস্থান তৈরি করবে।

বাংলাদেশ প্যাকেজিং আইন বাস্তবায়ন করার জন্য সবচেয়ে বড় ভূমিকা ছিল মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। গতবছর প্রথম পাট দিবস উদযাপনের পর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে পাঁচদিন ব্যাপি পাট মেলার আয়োজন করা হয়েছিল। এরপর এ বছর পাট পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ এবং বহুমুখী পাটপণ্য উৎপাদনে উৎসাহিত করতে দ্বিতীয় বারের মতো জাতীয় পাট দিবস উদযাপনের পরেও পাট পণ্যের মেলার আয়োজন করা হয়। এই মেলার ফলে পাট পণ্যের অভ্যন্তরীণ ব্যবহার ও রপ্তানি সম্প্রসারণে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। তবে এই প্যাকেজিং আইন মুক্তবাজার অর্থনীতিতে কতটুকু সুফল বয়ে আনবে তা সময়ই বলে দেবে।

লেখক: বিজনেস এডিটর, এটিএন বাংলা। দেশের অন্যতম নারী উদ্যোক্তা। কো-চেয়ারম্যান, এসএমই, পাট, ইয়াং এন্টারপ্রাইনার ও পুঁজিবাজার বিষয়ক স্ট্যান্ডিং কমিটি, এফবিসিসিআই।

Short URL: http://biniyougbarta.com/?p=5169

সর্বশেষ খবর