Responsive image

উন্নয়ন পরিকল্পনায় পরিবেশকেও সমান গুরুত্ব দেয়ার আহ্বান

নিজস্ব প্রতিবেদক, বিনিয়োগবার্তা: উন্নয়ন পরিকল্পনায় পরিবেশকেও সমান গুরুত্ব দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিশেজ্ঞরা।

তারা বলেণ, স্বাধীনতার পাঁচ দশক পেরিয়েছে বাংলাদেশ। এ সময়ে প্রভূত উন্নয়ন সাধিত হয়েছে, যা দেশে-বিদেশে প্রশংসাও কুড়িয়েছে। তবে এসব উন্নয়নের জন্য দেশের প্রাণ-প্রকৃতি আর পরিবেশকে দিতে হয়েছে চড়া মূল্য। জিডিপিনির্ভর উন্নয়ন কর্মকাণ্ড আরো খারাপ পরিস্থিতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এমন অবস্থায় দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনায় উন্নয়নের পাশাপাশি পরিবেশকেও সমান গুরুত্ব দেয়া সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে।

শুক্রবার  ‘ধরিত্রী ও নারী’ শীর্ষক এক অনলাইন বৈঠকে এসব কথা বলেন বক্তারা।

দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যভিত্তিক দৈনিক পত্রিকা বণিক বার্তা, বেসরকারি সংস্থা ওয়ান বিলিয়ন রাইজিং, নিজেরা করি ও সাংগাত যৌথভাবে বৈঠকটি আয়োজন করে।

অনলাইন বৈঠকটির মূল আলোচক ছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ।

তিনি বলেন, এখন আমরা দুটো বিপদের মধ্যে আছি। একটা হচ্ছে করোনা মহামারী, আরেকটা জলবায়ু পরিবর্তন। এ দুটো আবার পরস্পর সম্পর্কিত। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পৃথিবীর প্রাণবৈচিত্র্যের ভারসাম্য যেভাবে নষ্ট হয়েছে, তার প্রভাবেই কিন্তু নতুন নতুন ভাইরাস এসে মহামারী তৈরি করছে। আমরা প্রবৃদ্ধির যে গল্প শুনি, উন্নয়নের যে গল্প শুনি, সেখানে কেবল একপাশটার কথা বলা হয়। কতগুলো ভবন হলো, কতগুলো রাস্তা হলো সেসবের কথা বলা হয়। কিন্তু কার বিনিময়ে হলো, কী ধ্বংসের বিনিময়ে হলো, যেটা হারাল সেটা কে হারাল, আর যেটা পাওয়া গেল সেটা কে পেল, কার টাকা কোথায় গেল এবং এই যে পুরো সম্পদ তৈরি হচ্ছে, এর মালিকানা কার হাতে যাচ্ছে—এ প্রশ্নগুলো সব সময় অনুচ্চারিত থাকছে। বৈশ্বিকভাবে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে, আমাদের উন্নয়নচিন্তার মধ্যে এমন একটা ধরন তৈরি হয়েছে যে মানুষ উন্নয়ন বলে যেটা ভাবছে, সেটা তার নিজের ধ্বংসকে বৈধতা দিচ্ছে উন্নয়ন দিয়ে। এটা অনেকটা নিজের পায়ে কুড়াল মারার মতো। পরিবেশের কোনো ধরনের ক্ষতি না করেও কিন্তু উন্নয়ন সম্ভব। উন্নয়নের এ বিকল্প চিন্তাটি আমাদের সামনে আনা দরকার। পাহাড়, সমতল, বন, নদী, ভূগর্ভস্থ পানি, মানুষ—সবার অধিকারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে উন্নয়নটা করতে হবে। এটা তখনই সম্ভব হবে, যখন সামগ্রিকভাবে আমরা ধরিত্রীকে গুরুত্ব দেব।

বৈঠকটিতে সভাপতিত্ব করেন ওয়ান বিলিয়ন রাইজিং, নিজেরা করি ও সাংগাতের সমন্বয়কারী খুশী কবির। তিনি বলেন, নারীর সঙ্গে প্রকৃতির নিবিড় সম্পর্ক। যখন প্রকৃতি হুমকির মুখে পড়ে, তখন সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েন নারী। আমরা বাংলাদেশের মধ্যে থেকে আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদকে ধ্বংস করে প্রকৃতি আর পৃথিবীকে বিপন্ন করে তুলছি। আমাদের পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থাও একই কাজ করছে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে আমরা দেখি খুবই পুরুষতান্ত্রিক একটা ব্যবস্থা হিসেবে। মুনাফাকেই এ ব্যবস্থায় প্রাধান্য দেয়া হয়। পুঁজিবাদী ব্যবস্থা সাধারণ জনগণকে যেমন শোষণ করে, তেমনি পরিবেশ-প্রকৃতিকেও সমানভাবে শোষণ করে। এখন সময় এসেছে আমাদের এসব শোষণের বিরুদ্ধে সচেতন হওয়ার। আমাদের প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশের জন্য সঠিক উন্নয়ন পরিকল্পনাটি বেছে নেয়ার।

এর আগে সূচনা বক্তব্যে বণিক বার্তা সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ বলেন, গত ৫০ বছরের অর্থনৈতিক অগ্রগতি নিয়ে দেশের ভেতরে এবং আন্তর্জাতিক মহলে অনেক প্রশংসা আমরা শুনছি। কিন্তু আমরা কখনই দেখি না, অর্থনৈতিক উন্নতি করতে গিয়ে আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদগুলোকে কতটা ভালোভাবে ব্যবহার করেছি আর সেগুলোর কতটা ক্ষতি করেছি। পৃথিবীর সবচেয়ে দূষিত বাতাসের দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ একটি। বিশ্বব্যাংকের তথ্য বলছে, পরিবেশগত কারণে পুরো পৃথিবীতে মানুষের মৃত্যুর হার ১৬ শতাংশ। আর বাংলাদেশে এটা প্রায় ২৮ শতাংশ। আমরা ধারাবাহিকভাবে পরিবেশগত বিপর্যয়কর পরিস্থিতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। পরিবেশের এ বিপর্যয়কর পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছেন নারীরা। আমরা সব সময় আমাদের জিডিপি কত বড় হয়েছে তার হিসাব করি। কিন্তু আমরা কখনো দেখি না পরিবেশগত যে ক্ষতিগুলো হচ্ছে, সেগুলোর আর্থিক মূল্য কত, সামাজিক মূল্য কত।

বহুজাতিক কোম্পানিগুলো কৃষিকে পুরোপুরি বাণিজ্যিকীকরণ করে ফেলেছে বলে দাবি করেন রংপুরের ভূমিহীন নেতা মাহামুদা বেগম।

তিনি বলেন, কৃষক কী উৎপাদন করবেন, কীভাবে করবেন, সেগুলো যেমন বহুজাতিক কোম্পানিগুলো ঠিক করে দেয়, তেমনি কৃষিপণ্যের দামও নিয়ন্ত্রণ করে তারাই। বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর জন্য নেয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ ভূমির উর্বরতা কমিয়ে দিচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি।

অন্যদিকে রাঙ্গামাটির কৃষক সুজাতা চাকমা বলেন, বাণিজ্যিকীকরণের বিরূপ প্রভাব তাঁতশিল্পের ওপরও পড়েছে। আমরা আগে প্রয়োজনীয় কাঁচামালগুলো নিজেরাই উৎপাদন করতাম। কিন্তু এখন সবকিছুর জন্যই বাজারমুখী হতে হচ্ছে। কোনো কিছুরই নিয়ন্ত্রণ আর আদিবাসী সম্প্রদায়ের হাতে নেই।

রামপালে কয়লাবিদ্যুৎ কেন্দ্র হওয়ার আগে এবং পরের পরিবেশ-প্রতিবেশ নিয়ে কথা বলেন বাদাবন সংঘের নির্বাহী পরিচালক লিপি রহমান।

তিনি বলেন, আগে অনেক গাছপালা ছিল। ধানক্ষেত ছিল। সবুজ প্রকৃতি ছিল। সর্বোপরি মানুষের জীবন সহজ ছিল। কিন্তু এখন এ জায়গাটিতে যান্ত্রিকতা ঢুকে গেছে। এটা মানুষের জীবনকে আগের চেয়ে কঠিন করে তুলেছে।

বেসরকারি সংস্থা স্পার্কের নির্বাহী পরিচালক ও সাংগাতের সদস্য মুক্তাশ্রী চাকমা সাথী বলেন, আদিবাসী পুরো জাতিগোষ্ঠীর সঙ্গেই প্রকৃতির একটা নিবিড় সম্পর্ক ছিল। বছরের পর বছর ধরে আদিবাসী সম্প্রদায় নিজ এলাকার জীববৈচিত্র্যকে রক্ষা করে এসেছে। কিন্তু ষাটের দশকে কাপ্তাই লেক হওয়ার পর পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টে যেতে শুরু করে। পুঁজিবাদী ধ্যান-ধারণা আদিবাসীদের ওপর জোর করে চাপিয়ে দেয়া শুরু হয়। যার বিরূপ প্রভাব পড়েছে পাহাড়ের জীববৈচিত্র্যে।

প্রাগ্রসরের নির্বাহী পরিচালক ও সাংগাতের সদস্য ফৌজিয়া খন্দকার বলেন, নারীদের জন্য বলতে গেলে পুরো পৃথিবীই একটি যুদ্ধক্ষেত্র। প্রাকৃতিক বিপর্যয়েও এ নারীরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে আসছেন। এ ক্ষতির জায়গাটি কম-বেশি সব নারীর জন্যই এক। এর মধ্যেও যেসব নারী দরিদ্র, শোষিত—তারা সবচেয়ে বেশি অসুরক্ষিত অবস্থার মধ্যে রয়েছেন।

বাংলাদেশ কৃষক সমিতির নির্বাহী কমিটির সদস্য লাকি আক্তার বলেন, প্রতি বছর আবাদি জমির পরিমাণ কমে আসছে। অন্যদিকে কৃষক পণ্যের ন্যায্য দাম না পেয়ে কৃষিকাজই ছেড়ে দিয়েছেন। এর সঙ্গে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ও কৃষকদের আরো বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সূত্র: বনিকবার্তা।

(এসএএম/২৪ এপ্রিল ২০২১)

 

Short URL: https://biniyougbarta.com/?p=142871

সর্বশেষ খবর