Responsive image

কেন বেসরকারি শিক্ষা খাতে প্রণোদনা নয়?

ড: মিহির কুমার রায়: কোভিড-১৯ মহামারীর সংক্রমন ঠেকাতে  সরকার গত ১৭ই মার্চ, ২০২০ থেকে দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষনা করে, যা  আগামী ২৪শে মে, ২০২১  পর্যন্ত বলবৎ থাকবে। এখানে উল্লেখ্য যে, কেবল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ব্যতীত অর্থনীতির সকল কর্মকান্ডে নিয়োজিত প্রতিষ্ঠান খুলে দেয়া হয়েছে। শিক্ষা যেহেতু একটি সেবা খাত, তাই অনান্য খাতের মত এর ক্ষতি নিরুপন করা এত সহজ হবে না।  কিন্তু ইউনেস্কো বলেছে, নোভেল করোনার কারনে বাংলাদেশের প্রায় ৪কোটি বিভিন্ন  স্থরের শিক্ষার্থী  ক্ষতিগ্রস্থ হবে বলে তারা আশঙ্কা করছে এবং এছাড়াও  ২ কোটি ৪০ লাখ শিক্ষার্থী ঝড়ে পড়তে পারে বলে ঈঙ্গিত করা হয়েছে। অর্থ্যাৎ শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিবাবক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগক্তাগনও এই ক্ষতির  হুমকিতে রয়েছেন।

প্রথমে আসা যাক শিক্ষার্থীদের বিষয় নিয়ে; যেখানে  বাংলাদেশে  প্রাইমারী স্কুলের শীক্ষার্থী ২ কোটি ,ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের শিক্ষার্থী ৪ লাখ, মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষার্থী ১ কোটি, উচ্চ মাধ্যমিক স্কুল ও কলেজের  শিক্ষার্থী ৪০ লাখ, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতায় স্মাতক ও স্মাতকোত্তর কলেজের শিক্ষার্থী  ২৮ লাখ, সরকারী-বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ৩৮ লাখ ও মাদ্রাসায় শিক্ষার্থী রয়েছে ৩৫ লাখ  (সূত্র: হারুন-অর-রশীদ, উপাচার্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়)। এখন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায়  সকল স্কুলে অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব হয়নি এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক নির্বাহী আদেশে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপণী (পিইসি),ইবতেদায়ি শিক্ষা সমাপণী (ইইসি),জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) ও জুনিয়র দাখিল সার্টিফিকেট (জেডিসি) পরীক্ষা প্রথাগতভাবে  নেয়া যায়নি  সত্যি। কিন্তু শিক্ষার্থীদের নলেজের ভান্ডার কতটুকু পূরন  হলো- তা নিয়ে সংশয় রয়েই গেছে।শেষ পর্যন্ত সরকার আইন সংশোধন  করে একটি বিশেষ কায়দায় উচ্চ মাধ্যমিকের ফল প্রকাশ রেছে যেখানে পাশের হার শতভাগ দেখানো হয়েছে এবং সংখ্যার দিক থেকে তা ১৩ লাখের উপরে রয়েছে; যারফলেপরবর্তিতে উচ্চশিক্ষায় ভর্তি যুদ্ধ খুবই প্রতিযোগিতা মূলক হবে। করোনার  সময়টিতে বিশেষত: গত বছরটিতে অনেক ক্ষেত্রে বেসরকারী খাতের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা সবচাইতে বিপাকে পড়েছে বিশেষত: যেগুলো সাংগঠনিকভাবে দুর্বল এবং স্কুল বন্ধ থাকায়  টিউশন ফি দেয়া থেকে তারা বিরত রয়েছে ,যদিও স্কুল কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে চাপ অব্যাহত রেখেছে। এই দৈন্যতার কারনে স্কুল কর্তৃপক্ষ শিক্ষকদের বেতন বন্ধ করে দিয়েছে এবং কোন প্রকার উপায় না পেয়ে  অনেকক্ষেত্রে চাকুরী থেকেও তাদেরকে অব্যাহতি দিয়েছে। শিক্ষায় অর্থ যোগানের জন্য শিক্ষার্থীরা তাদের অভিভাবকদের উপর সংগত কারনে নির্ভরশীল এবং করোনার কারনে দেশের ৩৫ শতাংশ কর্মকর্তা,কর্মচারী ও শ্রমিকের চাকুরী চলে গেছে,ব্যবসায়ীদের আয় কমেছে, অনেক বেসরকারী শিক্ষক চাকুরী, টিউশনি, কোচিং সকলই হাড়িয়ে এখন রাস্তায় বসেছে। স্কুল কর্তৃপক্ষ ও উদ্যোগক্তারা বলছেন, শিক্ষার্থীর টিউশন ফি হলো তাদের একমাত্র আয়ের উৎস। আর তা সময মত উঠে না আসলে স্কুলের প্রশাসনিক ব্যয় বহন করা তাদের পক্ষে সম্ভব হবে কি করে! এক্ষেত্রে সরকারী প্রনোদনা প্রয়োজন রয়েছে বলে যুক্তি তাদের।

এখন আসা যাক সরকারী কাঠামোর শিক্ষকদের কথায়- যাদের কোন অস্তিত্বেও সংকট নেই এবং স্কুল বন্ধ থাকলেও বেতন- ভাতাদি সরকার যথানিয়মে বহন করছে- যা সকল পর্যায়ের শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।  কিন্তু  বেসরকারী  প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে একেবারে উল্টো চিত্র।

এখন আসা যাক শিক্ষায় প্রযুক্তির ব্যবহার- যা এখন খুবই জোড়ে-সোড়ে চলছে।অনেক প্রতিবন্ধকতা থাকা সত্বেও শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে ইউজিসির  নির্দেশক্রমে বেশিরভাগ বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় গত মে মাস থেকে এবং সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পহেলা জুলাই থেকে পর্যায়ক্রমে অনলাইনে ক্লাশ চালু করেছে। যার পদ্ধতিগুলো হলো – জুম, গুগোল, ফেসবুক- যার যার সুবিধমতো। বেসরকারী কিংবা সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দুর্বল আইটি পরিকাঠামোর কারনে শিক্ষক/শিক্ষার্থী যে সকল প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হচ্ছেন সেগুলো হলো – দুর্বল ইন্টারনেট সংযোগ, নিম্নমানের ডিভাইস, ইন্টারনেটের মূল্য  পরিশোধে অপারগতা ইত্যাদি । তাছাড়াও বিশেষ করে প্রাইমারী, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের যে সকল প্রতিষ্ঠান  অনলাইন, রেডিও এবং টেলিভিশনের মাধ্যমে কার্যক্রম শুরু করতে সক্ষম হয়েছে, সে জায়গায় দেখা গেছে অনেক শিক্ষার্থীর ই-মেইল একাউন্ট, ল্যাপটব, স্মার্ট ফোন বা আই-ফোনের কোনটাই নেই; যা তাদের আর্থসামাজিক অবস্থার বর্হিপ্রকাশ মাত্র। এই পদ্ধতি শিক্ষার্থীর মেধা কিংবা চরিত্র গঠনে কতটুকু সহায়ক হবে -সে প্রশ্ন নাইবা করলাম।

এ প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক বার্তাসংস্থা  ‘সিএনএন’কে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে  বিল গেটস বলেছিলেন, দূরবর্তি শিক্ষার জন্য প্রযুক্তির ব্যবহার শিক্ষার বৈষম্যকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।

এখন আসা যাক ব্যবহারিক ক্লাস নিয়ে। বিশেষত: চিকিৎসা, প্রকৌশল, কৃষি, রসায়ন, পদার্থ বিদ্যা ইত্যাদি- যা মুলত: ল্যাবরেটরীভিত্তিক। এসব ক্লাস অনলাইন পদ্ধতিতে কিভাবে হবে -তা নীতিনির্ধারকদের বিষয়। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে ইউজিসি  ল্যাব/ওয়ার্কশপভিত্তিক ক্লাশের ব্যাপারে এখন পর্যন্ত নমনীয়  সত্যি, তাহলে যারা এ সকল বিষয়ের শিক্ষার্থী তাদের প্রায় অর্ধেকেরই বেশী সিলেবাস মতে ব্যবহারিক ল্যাবভিত্তিক হলে তাদের শিক্ষা কার্যক্রম কি অসম্পুর্ণ থাকবে না ?

এখন আসা যাক পরীক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে- যা সনাতনী প্রথায় ক্লাসভিত্তিক অভ্যস্ত নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থায় পরীক্ষা দিয়ে তা হঠাৎ করে অনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থায় বাড়ীতে বসে  হলে তা কতটুকু স্বচ্ছ নিরপেক্ষ হবে?  শিক্ষা গবেষকগন বলছেন, প্রশ্নের ধারা পরিবর্তন করতে হবে, যাতে সৃজনশীলতাই পরীক্ষার একমাত্র নিয়ামক হয়। কিন্তু কিছু বিষয় আছে যেমন- অর্থনীতি, চিকিৎসা, প্রকৌশল,কৃষি- যেখানে বই বহির্ভুত অন্য কিছুর সংযোজনের সুযোগ নেই। তাছাড়া এ ধরনের একটি নতুন পদ্বতিতে কোন কায়দায়, কি প্রশ্ন করতে হবে- এ ব্যাপারে শিক্ষকদের আগ্রহ বা  পারদর্শিতা কতটুকু, তা নিয়েও প্রশ্ন  রয়েছে।পরীক্ষা শেষে উত্তরপত্র পাঠাতে পিডিএফ ফাইল তৈরি করতে হয়,  যা অনেক শিক্ষার্থী জানে না। আবার যে সকল লেখা প্রিন্ট করে পাঠায় সে গুলো অস্পষ্ট থাকায় শিক্ষকের পক্ষে বিষয়বস্তু উদঘাটন করেও মুল্যায়ন করা কঠিন হয়ে দাড়ায়। অনেক ক্ষেত্রে কারিগরি ত্রুটির কারনে উত্তরপত্র ই-মেইলে পাঠালেও  তা শিক্ষকের কাছে পৌছায় না।

এখন  আসা যাক আর্থিক বিষয় নিয়ে; যেখানে ছাত্র শিক্ষকের  খরচের বিষয়টি জড়িত। বিশেষত: ইন্টারনেটের জিপি ক্রয়ের বিষয়টি।

হিসাব বলছে, এই পদ্ধতিতে প্রযুক্তি ব্যবহারের খরচ আছে মাসে নুন্যতম ২০০০ টাকা; যা অনেক শিক্ষার্থীর অভিভাবকের জন্য বহন করা অসহনীয়।এখন অনেকেই করোনার কারনে আয় সংকোচনে পরেছে বা চাকুরি হারিয়ে পথে বসেছে-তাদের জন্য এটি কষ্টকর।

এখন আসা যাক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার কারনে শিক্ষা প্রশাসনে তার প্রভাবটা কি?

যারা গত বছরে (২০২০) মাধ্যমিক পাস করেছে তাদের অনলাইনে ভর্তি  হয়েছে, উচ্চ মাধ্যমিকের  পরীক্ষার ফল (২০২১) এ প্রকাশ হলেও ভর্তি কবে শুরু হবে তাও অনিশ্চিত। যার সাথে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে স্মাতক শ্রেনীতে ভর্তির একটা সংযোগ রয়েছে অর্থাৎ বিগত ১১ মাসে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো লকডাউনে থাকায় শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিবাবক ও উদ্যোগক্তারা  যে ক্ষতির সন্মুখিন হয়েছেন- তা পোষাতে সরকারের কি পরিকল্পনা রয়েছে- তা বুঝা যাচ্ছে না।কিন্তু যে শিক্ষক পরিবেশ পরিস্থিতির কারনে চাকুরীচ্যুত হয়েছেন কিংবা যে উদ্যোক্তা তার ব্যবসায় ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন- তা কাটিয়ে উঠতে  সরকারেরই বা করনীয় কি ? অথচ, সেই সকল পরিবারের সদস্যদের মধ্যে শিক্ষার্থীও রয়েছে। এ ধরনের একটি পরিস্থিতিতে প্রাথমিক ও গনশিক্ষা মন্ত্রী বলেছিলেন, করোনার পরিস্থিতির উন্নতি না হলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা সম্ভব হবে না এবং প্রয়োজনে  স্কুলে অটো প্রমোশনের ব্যবস্থা করা হতে পারে। যদিও পরবর্তীতে শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের  নির্দেশক্রমে নমিনেল পরীক্ষার মাধ্যমে পরবর্তী শ্রেনীতে  প্রমোশনের ব্যবস্থা করা  হয়েছে। সরকারের অবস্থান যদি তাই হয় তবে জীবন জীবিকার তাগিদে যখন অর্থনীতির  সকল খাত খুলে দেয়া হয়েছে- তা হলে বেসরকারি শিক্ষকতা পেশায় জড়িত লোকদের জীবিকায়নের প্রক্রিয়া বন্ধ থাকবে কেন? এই প্রশ্নের উত্তর  খোঁজা কি কঠিন বলে প্রতিভাত হয়?

এখানে উল্লেখ্য যে, ১লা সেপ্টেম্বর থেকে ইংল্যান্ডে সববর্ষের  শিক্ষার্থীরা  ক্লাসে ফিরেছে এবং হুইটি বলেছেন স্কুলে  না গেলে শিশুরা দীর্ঘমেয়াদী  মানসিক ও শারীরিক ঝুকিতে পড়তে পারে। এই চিকিৎসক ও গবেষক বলেছেন, যে সকল শিশু করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন তারা আাগে থেকেই কোন না কোন স্বাস্থ্য জনিত জটিলতায় ভুগছিলেন। আজ যারা প্রাথমিক পর্যায়ে লেখাপড়া করছে তাদের ভিতর থেকেই মেধাবী শিক্ষার্থীরা  ১০-১৫ বছর পর উচ্চশিক্ষায় বিভিন্ন বিষয়ে ভর্তি হবে এবং প্রাথমিক পর্যায়ে তাদের ভীত যদি দুর্বল হয়,  তবে জাতির ভিত্তি মজবুত হবে কি করে?

শিক্ষার ক্ষেত্রে একটি বিষয় লক্ষনীয় হলো- সার্বিক আয়োজনটি হয়ে গেছে পরীক্ষাকেন্দ্রিক, নলেজভিত্তিক নয়।আর এই প্রতিযোগিতায় ভাল গ্রেড পাওয়া-ই মূল লক্ষ্য। যার জন্য যা কিছু করা দরকার সেটাই চলছে বৈধ কিংবা অবৈধ পথেই হউক না কেন।ফলে শিক্ষার্থীর তুলনায় অভিবাবকদের বেশী তৎপর হতে দেখা যায় শিক্ষার্থীর মতামতকে উপেক্ষা করে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সাথে পরীক্ষা গ্রহন অপরিহার্য সত্যি।

কিন্তু সেটি কিভাবে হবে সেই সম্পর্কে প্রথম গবেষনাটি করেছিলেন প্রাচ্যের অকসফোর্ড বলে খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য স্যার ফিলিপ জে হাটগ। তিনি সারা ভারতবর্ষ ঘুরে যে গবেষনাপত্রটি তৈরী করেছিলেন- তা সারা কমনওয়েলথভুক্ত দেশসমুহে প্রসংশিত হয়েছিল।তবে এই গবেষনার প্রায়োগিক ফলাফল নিয়ে কেউ কিছু করতে পেড়েছিলেন কিনা – তা আর জানা যায় নি।

জর্জ বার্নাডশ তার ম্যান এন্ড সুপারম্যান নাটকে একটি চরিত্রের মাধ্যমে ব্যাঙ্গাত্বক সুরে বলেছিলেন, যে পারে সে করে, আর যে পারে না  সে হয় শিক্ষক। শিক্ষকদের সক্ষমতা নিয়ে এ ধরনের বক্তব্য আমাদের সমাজে নূতন নয়।তারপরও সমাজের নানান পরিবর্তন সত্বেও শিক্ষকের একটি ভূমিকা সমাজ থেকে বিলীন হয়ে যায় নি। শিক্ষক এখনও মানুষ গড়ার কারিগর এবং বর্তমান প্রজন্মের  শিক্ষর্থীদের  মাঝে নেতৃত্ব সৃষ্টির প্রধান  দায়িত্ব শিক্ষকদের।  যা সমাজের  আরও দশটি পেশা থেকে ভিন্ন যদিও সমাজ সেটি উপলব্দি করতে পারছে না -যার জন্য রাষ্ট্রকে অনেক মূল্য দিতে হচ্ছে।

এখন আসা যাক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার ব্যাপারে  পাবলিক সেন্টিমেন্ট কি  এবং এর সাথে সরকারের অবস্থান কি? বছরের শেষ প্রান্তে এসে শিক্ষায় সেসন  জট কিভাবে নিরসন হবে ?  এও শোনা যাচ্ছে ২৬শে মে  থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দেয়া ঠিক হবে কি না ?  শিক্ষার্থীদের ক্ষতি পোষাতে পরবর্তি শ্রেনীতে প্রমোশন দেয়া ঠিক হবে কিনা ?

এ ব্যাপারে  সরকারের  প্রতিক্রিয়া মিশ্র; করোনা ভাইরাসের সংক্রমন যেহেতু একটি বৈশ্বিক সমস্যা তাহলে বিশ্বের  অনান্য দেশ তাদের শিক্ষা সংকট নিয়ে এগুচ্ছে- সে বিষয়ে আলোকপাত করা প্রাসঙ্গিক বলে প্রতিয়মান হয়।

অস্ট্রেলিয়া প্রথম দিকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলা রাখার পর   পরিস্থিতির অবনতি ঘটলে আবার  প্রতিষ্ঠান বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয় দেশটির সরকার।  জার্মানীর একটি রাজ্যে  আগস্টের  প্রথম দিকে  শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দেয়ার পর পাবলিকের ঘোর আপত্তির  কারনে আবার প্রতিষ্ঠান বন্ধ করতে বাধ্য  হয়  সরকার। আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত সংক্রমনের দিক থেকে বিশ্বে ২য় স্থানে রয়েছে বিধায় সে  দেশের সরকার বর্তমানে   প্রতিষ্ঠান খোলার পক্ষে নয়।মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি  রাজ্যে গত আগষ্টে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার উদ্যোগ নিলেও প্রেসিডেন্টের প্রধান স্বাস্থ্য  উপদেষ্ঠা ডা: স্কট এটলাসের  তীব্র আপত্তির মুখে  রাজ্য সরকার এটি আর বাস্তবায়ন করতে পাড়েনি । বাংলাদেশ সরকার স্বাস্থ্য ঝুঁকিটাকেই সবচেয়ে বেশী প্রাধান্য দিচ্ছে। এ কারনে যে প্রতিদিনই দেশের মিডিয়াগুলো বৈশ্বিক বনাম বাংলাদেশের সংক্রমন, সুস্থতা ও মৃত্যুর হার প্রচার করে চলছে- যার সাথে দেশের স্বাস্থ্য  ব্যবস্থার ইমেজ জড়িত রয়েছে।শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিবাবক ও উদ্যোক্তা- এই চারটি স্টেকহোল্ডার যারা বেসরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত, তাদের অস্বিত্বের প্রশ্নে আন্দোলনের পথ বেছে নেবে কি?

এরমধ্যে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত কলেজসমূহের শির্ক্ষার্থীদের স্মাতক  (সম্মান) ও স্মাতকোত্তর পরীক্ষা বিলম্বের  কারনে আন্দোলনের হুমকি দিচ্ছে, যা কাম্য নয়।

এখন সরকারের সামনে কতগুলো বিকল্প সুযোগ তৈরী হয়েছে, যা বিবেচনায় নেয়া যেতে পারে। যেমন:  অতি দ্রুত বেসরকারী-সরকারী পর্যায়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো চালু করা এবং স্বাস্থ্য বিধি মেনে, সামাজিক দুরত্ব বজায় রেখে ছাত্র-শিক্ষক সবাই যার যার ক্লাসে উপস্থিত থাকবে।যদি অবস্থার সত্যি সত্যি উন্নতি হয় ভাল, আর যদি না হয় তবে পূর্বের অবস্থায় ফিরে যাবে।বিগত ১১ মাসে বেসরকারী খাতের  প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় উদ্যোক্তা ও শিক্ষকগন যে আর্থিক সঙ্কটে পড়েছে তা পোষিয়ে নেয়ার জন্য সরকার সঙ্কটকালিন  সময়ের জন্য প্রনোদনা ঘোষনা করতে পারে যেমনটি সরকার অন্যান্য খাতের জন্য করেছে। উদ্যোগক্তাদের ব্যবসায়িক মনোভাব পরিবর্তন করতে হবে এ কারনে যে, শিক্ষা কোন পণ্য নয়, এটি একটি সেবা খাত। কিন্তু  অনেক ক্ষেত্রেইে ধারাটি লংঘনের আলামত পাওয়া যাচ্ছে, যা সবাই জানেন।দুর্যোগ কখন আসবে কেউ জানে না। যার জন্য বাৎসরিক লভ্যাংশ থেকে আপদকালীন ফান্ড গঠন করা সময়ের দাবি। করোনাকালের শিক্ষা ব্যবস্থার রূপান্তর নিয়ে দেশের মধ্যে কেউ ভাবছে- তা বুঝা দুষ্কর। কারন,  সরকার প্রথম থেকেই একলা চলা  নীতিতে চলছে, যদিও সেটি একটি জাতীয় সমস্যা। সরকার  এ ব্যাপারে শিক্ষাবিদদের  সাথে  পরামর্শ করতে পারেন।

সবশেষে বলা যায়, কোভিড-১৯ পরিস্থিতির দ্রুতই অবসান হবে- তা এই মূহুর্তে বলা যায় না। অর্থনীতিসহ জীবন জীবিকার ক্ষতি পুষিয়ে নিয়ে সরকারের উদ্যোগের কোন ঘাটতি নেই। এ পর্যায়ে শিক্ষা বিশেষজ্ঞ, গবেষক, নীতি-নির্ধারকবৃন্দ সার্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে নিবেন এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে যে আর্থিক দূর্বলতা করোনার কারনে সৃষ্টি হয়েছে-সে ব্যাপারে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ইউজিসি কার্যকরি ব্যবস্থা গ্রহন করবেন।

লেখক: সিন্ডিকেট সদস্য ,ডীন ও অধ্যাপক, সিটি ইউনিভাসিটি।

(এসএএম/২৯ এপ্রিল ২০২১)

 

 

 

 

Short URL: https://biniyougbarta.com/?p=143600

সর্বশেষ খবর