Responsive image

জবি’৯৫ রি-ইউনিয়নের গল্প

মুহাম্মদ জাভেদ হাকিম: দক্ষিণ এশিয়ার সবচাইতে বড় বিদ্যাপিঠ আমাদের জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। হ্যাঁ আমাদেরই বিশ্ববিদ্যালয়। কারণ, আমরা শুধু সহপাঠিই ছিলাম না। ছিলাম দলমত নির্বিশেষে সবাই সবার ভাল বন্ধু। যেখানে রাজনৈতিক মতাদর্শ ছিল মননে। কিন্তু মস্তিষ্কে ছিল সহপাঠীদের জন্য প্রগাড় ভালোবাসা। আমার কথাগুলো কি তৈলাক্ত মনে হয়? মোটেও না। চোখ বন্ধ করে ফিরে যাও ফেলে আসা স্মৃতির ক্যাম্পাসে। আর চোখ মেলে তাকাও ফার্স্ট রি-ইউনিয়নের স্থান নাহার গার্ডেনের ময়দানে।

এতোক্ষণ বেশ শক্ত কথা লিখেছি। এবার আসবো ধীরে ধীরে নরম সুরের কথায়। ক্যাম্পাসের পাঠ বেশির ভাগ বন্ধুদেরই চুকে গেছে অনেক আগেই। মাঝে কেটে গেছে দীর্ঘ প্রায় ২১ বছর। যাপিতজীবনের হাজারো ব্যস্ততায় বহুজন নানা দিকে ছিটকে গেছে। ছাত্রজীবনে দিনের অধিকাংশ সময় কাটানো বন্ধুদের কারো কারো  সঙ্গে কালেভদ্রে দেখা বা কথা হয়েছে। কারো সঙ্গে আবার কোনো যোগাযোগই হয়তো ছিলো না। এরকম অবস্থায় সব বিভাগের বন্ধুদের নিয়ে রি-ইউনিয়ন করাটা সাহসিকতার কাজই শুধু নয়; বরং বেশ চ্যালেঞ্জিংও বটে। প্রধান আয়োজক পারভেজ আর তার মনোবল চাঙ্গা রাখার উপাদেয় প্রদানকারী সোহেল, শিপন, শোভন, শামীম, মিজান, শাহ আলম, ঝর্ণা, শ্যামল, জাহিদ, লিটন, মাসুদ, পল্লব, স্বপনসহ আরো কয়েকজন। ওদের আপ্রাণ প্রচেষ্টায় শতশত বন্ধুদের উপস্থিতিতে গেলো ১২ ফেব্রুয়ারী ২০২১ শুক্রবার, ৯৫-৯৬ ব্যাচের ফার্স্ট রি-ইউনিয়ন বেশ ঝাঁকজমকভাবে পালন করা সম্ভব হয়েছে। শুধু মিলনমেলা ঘটাতেই সক্ষম হয়নি তারা। বেশ সাফল্যের সঙ্গে তা পরিসমাপ্তিও টানতে পেরেছে। আমি জানতাম মানে তাদের প্রতি দৃঢ় আস্থা ছিল; তাই আয়োজনের আগের রাতেই আয়োকজকদের অগ্রিম ধন্যবাদ জ্ঞাপন করতে কার্পণ্য করিনি। বিশেষকরে ব্যক্তিগতভাবে আমি ছিলাম বেশ এক্সসাইটেড। বহুকাল পরে, বহু চেনা মুখগুলোর সঙ্গে দেখা হবে, কথা হবে, গল্প হবে, ভুলে যাওয়া অনেক মজার কথা হয়তো কোনো বন্ধু অকপটে মনে করিয়ে দিবে-এসব ভেবে। এসব ব্যাপারগুলো আমার বেশ ভালো লাগে। জগন্নাথের কোন আয়োজন এলেই আমার সেদিন অন্যকোনো প্রোগ্রামের ডেট পড়ে যায়। বিশেষকরে, দে-ছুট ভ্রমণ সংঘ’র কোন আয়োজনের তারিখ মিলে যায়। এরআগেও নিজ ডিপার্টমেন্ট পলেটিক্যাল সাইন্স এর দুটো প্রোগ্রাম মিস করেছি। তাই এবার আগেভাগেই প্রস্তুত ছিলাম। প্রস্তুতি নিতে নিতে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ চলে এলো। সাজ সকালেই প্রস্তুত আমি। মানিক মিয়া এ্যাভিনিউ হতে গাড়ি ছাড়বে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জন্য নির্ধারিত বাস নাম্বার। আমি উঠব পতিমধ্য থেকে। উজ্জ্বলকে বলে রেখেছিলাম সিট রাখিস। কিন্তু আস্থা ছিল কম। কারণ, বান্ধবী পেলে বন্ধুর কথা বেমালুম ভুলে যাবে নিশ্চিত। তাই জাফরকেও বলে রেখেছিলাম। পথিমধ্যে আমি বাসে উঠলাম। হ্যাঁ, যে ভাবনা তাই সত্যি। বান্ধবীর স্বামী পরিচয়ে বেশ খোঁশ মেজাজে উজ্জল দোস্ত আমার। তবে বেতাগীর জাফর আমায় নিরাশ করেনি। ব্রেকফাস্টসহ আসন রেডি রেখেছে। আতিকুজ্জামান জাহিদ আমাকে গিরিঙ্গী করে মাইক্রোতে পাঠিয়ে, ডেইজির গান শুনা হতে বঞ্চিত করতে চেয়েছিল। তবে তোপের মুখে তা আর টিকেনি। অগত্যা সেও আর মাইক্রোতে যায়নি। বাস ভর্তি সব রাষ্ট্রবিজ্ঞানি দোস্ত বন্ধুদের হৈ-হুল্লরে মিলেতালে ভরপুর। রাকিব অনেক বান্ধবীদের ভিড়েও আমার খোঁজ রাখতে ভুল করেনি। বাস যেতে যেতে সাভার ছাড়িয়ে মানিকগঞ্জর নাহার গার্ডেন। বেলা তখন প্রায় ১১টা। গাড়ি থেকে নামতেই দেখা হয়ে যায় ৯০ দশকের কাঁঠালতলার একদল সহযোদ্ধার সঙ্গে। তারাও যেন আমাদের পেয়ে বেশ উৎফুল্ল। আসলে এটাই নিখাদ বন্ধুত্বের বন্ধন।

টোকেন নিয়ে নির্ধারিত কাউন্টারে গিয়ে লাইন ধরে গিফট বুঝে নিই। টিশার্ট, ব্যাগ, মগ ও কোটপিন। উপহার সামগ্রীগুলো আমার জীবনে পরম পাওয়া। বেলা বাড়ার সাথে সাথে দেখা হতে থাকে অনান্য ডিপার্টমেন্টের পরিচিত সহপাঠী ও বন্ধুদের সঙ্গেও। এরই মধ্যে কেউ আবার স্মৃতির ডালি মেলে ধরল।

মুকিত বলল, বাদামতলীর ফল ও জাহাজের ঐতিহাসিক স্মৃতি বিজড়িত ইতিহাস। যা আমি একদম ভুলেই গিয়েছিলাম। শামীম আল মাসুদ সেই আগের মতোই আছে। কোথাও স্থির না বসে, আমাকেও নাহার গার্ডেনের চিপায় চাপায় চরকির মত বেশ কিছুটা সময় ঘুরিয়েছে। তবে তার আপসোস সকালের সেশনের জন্য। ঢাকার বাইরে থেকে আসতে তার অনেকটা দেরি হয়ে যাওয়ায় সকালের ফটোসেশনসহ অনেকগুলো সেশন থেকে সে বঞ্চিত হয়েছে।

জুম্মার নামাজ শেষে জম্পেশ খানাপিনা। বোরহানিটা হয়েছিলো সেইরকম টেস্ট।

দুপুর গড়িয়ে বিকেল। অনেকেই নিজ নিজ ডিপার্টমেন্টের বন্ধুদের সঙ্গে চুটিয়ে আড্ডা মারতে পারলেও, আমরা যারা চরম মেধাবী [ পড়ালেখা + রাজনীতি ] ছিলাম তাদের আড্ডার নির্দিষ্ট গন্ডি ছিল না। কারণ, জগন্নাথের কাঁঠালতলার বেঞ্চে বসা ছাত্র-ছাত্রীরা প্রত্যেকেই ছিল প্রত্যেকের তরে। অর্থাৎ সব ফ্যাকাল্টির সঙ্গেই ছিলো অম্লমধুর সম্পর্ক। সুতরাং শুধু পাঠ্যপুস্তক নিয়ে পড়ে থাকা মেধাবিদের সঙ্গে আমাদের মত চরম মেধাবীদেরত কিছুটা পার্থক্য থাকবেই। হা হা হা।

ছাত্রজীবনের ইতিহাস হাতড়ে বেড়ানো আড্ডার সঙ্গে মঞ্চে চলছিলো পেশাদার শিল্পীদের গান। আমার কাছের বান্ধবীগুলো কেউ আসে নাই। যার কারণে কনসার্টে ড্রামের আওয়াজে নাচতে পারি নাই।

রাসেল, রানা, বাদশা, আশিক, জামান, সোহাগ, বাবলা, কবির, লতা, বিথী, জোতি, আফজাল, জিয়া, টনি, শুকুর, ডেইজি, জাহিদ, কবি ফরিদ, জব্বার, নিপু, পলাশ, বাদশা, সাগড়, নদী, মামুন, আলতাফ, সোহেল, মনির, স্বাধীন, পলাশ, আজিজ, টনি, জহির, শাওন, মহিন, তরুন ও হালিমসহ আরো অনেক বন্ধুর গল্প লিখার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু কিছুদিন আগে আমি সন্ত্রাসী হামলার শিকার হওয়ায়, এখনো মানসিকভাবে স্বাভাবিক হতে পারি নাই। ইনশাল্লাহ সামনের কোন আয়োজনের মাধ্যমে তুলে ধরার প্রচেষ্টা থাকবে। হৃদয়ের গভীর থেকে অনুভব করেছি আশিক, আরিফ, লেবু, সুজাত, বেলায়েত, আঁখি, কেয়া, নাসরিন, আমিন, চন্দন, বিউটি, সুলতানা, সুখী, জুয়েল, উর্মী ও সুমীকে। তোরা থাকলে হয়তো আনন্দটা আরো বেশি হত।

ক্ষনিকের জন্য মনটা খারাপ হয়ে গেলো প্রয়াত বন্ধু পনির, আব্বাস, মাহবুব ও বুলবুলের জন্য। অল্প সময়ের মধ্যেই আমাদেরকে ছেড়ে ওরা পরপারে পাড়ি জমালো। মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা আল্লাহ যেনো তাদেরকে বেহেশতের সর্বোচ্চ স্থানে আসীন করেন।

সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। শুরু হলো র‌্যাফেল ড্র। ঘোষণা আসতে থাকলো বিজয়ীদের কুপন নাম্বার। এ যাত্রায় কমপক্ষে ২৫জন বিজয়ীকে পুরষ্কৃত করা হয়েছে। একটা সময় সকাল হতে শুরু হওয়া অনাবিল আনন্দের রি-ইউনিয়নের পর্দা নামল। ঘরে ফিরতে শুরু করলো ৯৫-৯৬ সেশনের প্রায় নয়শত সাবেক জবিয়ান। চিৎকার করে তখন গাইতে ইচ্ছে করছিলো- আবার কি দেখা হবে বন্ধু/এরকম কোন আনন্দময় পরিবেশে/আবার কি আড্ডা হবে বন্ধু/আগামির জম্পেশ রি-ইউনিয়নে। এমন শুভ কামনা রেখে আজকের এই লেখা পরিসমাপ্তি টানলাম। ভাল থেকো বন্ধুরা।

(জাভেদ/শামীম/১৭ জানুয়ারি ২০২১)

Short URL: https://biniyougbarta.com/?p=137764

সর্বশেষ খবর