Responsive image
সর্বশেষ সংবাদ:

দেশে আন্তর্জাতিক কল ব্যবসার ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা

নিজস্ব প্রতিবেদক, বিনিয়োগবার্তা: একসময় বিদেশ থেকে দেশে যোগাযোগের মাধ্যম ছিল ফোনকল, যা দুবছর আগে পাল্টেছে। এখন ইমো বা হোয়াটসঅ্যাপের মতো ওটিটি (ওভার দ্য টপ) অ্যাপের মাধ্যমে যোগাযোগ করা যায় দেশের সাথে। বাংলাদেশের গ্রামে থ্রিজি সেবা চালুর পাশাপাশি সুলভে স্মার্টফোন কেনার সুযোগ তৈরি হওয়ায় অনেক প্রবাসীই এখন দেশে থাকা স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন ওটিটি অ্যাপের মাধ্যমে। আর এর প্রভাবে আন্তর্জাতিক কলের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। ফলে আন্তর্জাতিক কলনির্ভর ইন্টারন্যাশনাল গেটওয়েগুলোর ব্যবসার ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি হয়েছে শঙ্কা।

বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে বৈধ পথে আসা আন্তর্জাতিক কলের পরিমাণ দৈনিক দুই কোটি মিনিটের নিচে নেমে এসেছে। এর মধ্যে আইজিডব্লিউ লাইসেন্সধারী রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশনস কোম্পানি লিমিটেডের (বিটিসিএল) কল ৭০ লাখের কাছাকাছি। আর বাকি কল আসছে বেসরকারি খাতের ২১টি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। অথচ এক দশক আগে দৈনিক সর্বোচ্চ ১২ কোটি মিনিটের বেশি কল এসেছে। ২০১৫ সালে দেশে আসা আন্তর্জাতিক ইনকামিং কল ছিল ৩ হাজার ৭৪১ কোটি মিনিটের বেশি। পরের বছর এটি কমে দাঁড়ায় ২ হাজার ৭৮৯ কোটি মিনিট। আর ২০১৭ সালে আন্তর্জাতিক ইনকামিং কলের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৩০১ কোটি মিনিটের কিছু বেশি। দৈনিক হিসাবে এটি ৬ কোটি ৩০ লাখ মিনিট।

আন্তর্জাতিক ইনকামিং কল বিটিসিএলের আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির আয়ের ৫৯ শতাংশই এসেছিল বিভিন্ন আন্তর্জাতিক কল থেকে। তবে গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে আন্তর্জাতিক কল রেট কমিয়ে দশমিক ৬ সেন্ট করা হয়। আগে প্রতি মিনিট আন্তর্জাতিক কল থেকে বিটিসিএল আয় করত ১ দশমিক ৭৫ সেন্ট। কলরেট কমানোর প্রভাবে বিটিসিএলের আয়ে বেশ বড় ধরনের ধাক্কা লাগে। ফলে সংস্থাটির মোট আয়ই কেবল কমেনি, একই সঙ্গে আইজিডব্লিউ থেকে আয়ের অংশও কমেছে ৪৩ শতাংশ।

ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, সারা দেশে থ্রিজি সেবা সম্প্রসারিত হয়েছে। ফোরজিও বিস্তৃত হচ্ছে। চলতি বছর শেষে দেশব্যাপী ফোরজি সেবা নিশ্চিত করা হবে। ইন্টারনেট সেবা ও ডিভাইসের প্রাপ্যতার কারণে বিভিন্ন ওটিটি অ্যাপের ব্যবহার বেড়েছে। ফলে প্রথাগত ফোনকল কমেছে। আগামীতে এটি আরো কমে যাবে। এ খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর এখনই বিষয়টি নিয়ে ভাবতে হবে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ভাইবার, হোয়াটসঅ্যাপ, ইমোসহ ডাটাভিত্তিক বিভিন্ন ওটিটি অ্যাপের ব্যবহার বৃদ্ধির ফলে সরাসরি ডায়াল করা ভয়েস কলের পরিমাণ ক্রমান্বয়ে কমছে। আগামীতে ওটিটি অ্যাপের ব্যবহার আরো বাড়বে। ফলে সরাসরি ডায়ালের মাধ্যমে ভয়েস কলের প্রয়োজনীয়তাও আরো কমে আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অন্যতম আইজিডব্লিউ প্রতিষ্ঠান মীর টেলিকমের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মীর নাসির হোসেন বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রচলিত আন্তর্জাতিক কল ক্রমান্বয়ে কমে আসছে। ওটিটি অ্যাপগুলোর ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় আইজিডব্লিউ ব্যবসার পরিস্থিতি আগের অবস্থায় নেই। তবে আরো কিছু সময় হয়তো এ ধরনের কলের চাহিদা থাকবে।

২০০৮ সালে নিলামের মাধ্যমে চার প্রতিষ্ঠানকে আইজিডব্লিউ লাইসেন্স দেয়া হয়। আর ২০১২ সালের এপ্রিলে নতুন ২৫টি প্রতিষ্ঠান এ লাইসেন্স পায়। প্রয়োজনীয়তা যাচাই না করেই একসঙ্গে অনেকগুলো লাইসেন্স দেয়ায় খাতটিতে ভারসাম্যহীন প্রতিযোগিতা তৈরি হয়। এতে সরকারের রাজস্ব ক্ষতির পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানগুলোও ব্যবসায়িকভাবে ঝুঁকির মুখে পড়ে।

বার্ষিক লাইসেন্স ফি ও আয়ের ভাগাভাগির অংশসহ অন্যান্য পাওনা নিয়মিত পরিশোধ না করায় এরই মধ্যে ছয় আইজিডব্লিউর লাইসেন্স বাতিল করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো রাতুল টেলিকম, কেএওয়াই টেলিকমিউনিকেশনস, টেলেক্স, ভিশন টেল, অ্যাপল গ্লোবালটেল ও বেসটেক টেলিকম লিমিটেড। বকেয়া অর্থ আদায়ে লাইসেন্স বাতিল হওয়া ছয় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ আইন, ২০০১ ও পাবলিক ডিমান্ড রিকভারি (পিডিআর) অ্যাক্ট, ১৯১৩ অনুযায়ী মামলা করা হয়েছে। এছাড়া প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলাও করে কমিশন।

ছয়টি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল হওয়ায় বর্তমানে চালু রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন কোম্পানি লিমিটেডসহ ২২টি আইজিডব্লিউর কার্যক্রম।

এদিকে, আন্তর্জাতিক কল আদান-প্রদানে ২০১৫ সালের ২৪ জুন দ্বিস্তরবিশিষ্ট কল আদান-প্রদানের ব্যবস্থা হিসেবে পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা হয় আইজিডব্লিউ অপারেটর সুইচ (আইওএস)। একই বছরের ২৭ জুন থেকে আইওএসের মাধ্যমে সব আন্তর্জাতিক কল আদান-প্রদান করা হচ্ছে। সাত আইজিডব্লিউর উদ্যোগে গঠন করা আইওএফ এটি পরিচালনা করছে। নতুন এ ব্যবস্থার আওতায় আন্তর্জাতিক কল টার্মিনেশনের দায়িত্ব পালন করছে উদ্যোক্তা সাত আইজিডব্লিউ। এগুলো হলো গ্লোবাল ভয়েস, মীর টেলিকম, বাংলা ট্র্যাক, নভো টেলিকম, ইউনিক ইনফোওয়ে, ডিজিকন টেলিকমিউনিকেশনস ও রুটস কমিউনিকেশনস। আর স্তর-১-এ রয়েছে বাকি আইজিডব্লিউগুলো।

বর্তমানে আন্তর্জাতিক কল থেকে প্রাপ্ত আয়ের ৪০ শতাংশ বিটিআরসি, ২০ শতাংশ আইজিডব্লিউ, ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ ইন্টারকানেকশন এক্সচেঞ্জ (আইসিএক্স) ও ২২ দশমিক ৫ শতাংশ অ্যাকসেস নেটওয়ার্ক সার্ভিস (এএনএস) প্রোভাইডার পেয়ে থাকে। আইজিডব্লিউর মাধ্যমে আসা এসব কল আইসিএক্স হয়ে গ্রাহক পর্যায়ে পৌঁছে দেয় এএনএস প্রোভাইডার হিসেবে পরিচিত সেলফোন ও ফিক্সড ফোন অপারেটররা। আন্তর্জাতিক কল টার্মিনেশন রেট বর্তমানে মিনিট প্রতি শূন্য দশমিক ৬ সেন্ট।

(ডিএফই/০২ জানুয়ারি ২০২১)

Short URL: https://biniyougbarta.com/?p=133748

সর্বশেষ খবর