Responsive image

নরসিংদী পৌর নির্বাচনে লড়াই হবে ত্রিমুখী

মো: শাহাদাৎ হোসেন রাজু, নরসিংদী

নরসিংদী পৌরসভা নির্বাচন ১৪ ফেব্রুয়ারী। চতুর্থ  ধাপের এই নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে আসায় শেষ পর্যায়ের নির্বাচনী প্রচার-প্রচারনা জমে উঠেছে। মাঘের শীতেও নরসিংদীতে উত্তাপ ছড়াছে ভোটের হাওয়া। তীব্র এই শীতকে উপেক্ষা করে নাওয়া- খাওয়া ভুলে গিয়ে ভোর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত ভোটারদের বাড়ী বাড়ী ছুটছেন প্রার্থীরা। নির্বাচনকে ঘিরে ইতিমধ্যেই পৌর এলাকায় উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে।

চতুর্থ ধাপে অনুষ্ঠিতব্য নরসিংদী পৌর নির্বাচনে মেয়র পদে ৪ জন, ৩ টি সংরক্ষিত মহিলা ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে ১০ জন ও ৯ টি সাধারণ ওয়ার্ডে ৪২ জন কাউন্সিলর প্রার্থী প্রতিদ্বন্ধিতা করছে। মেয়র পদে প্রার্থী হলেন, আওয়ামী লীগ মনোনীত আমজাদ হোসেন বাচ্চু (নৌকা), বিএনপির হারুণ অর রশিদ (ধানের শীষ), ইসলামী আন্দোলন, বাংলাদেশের মো: আসাদুল হক হামিদ (হাত পাখা)  এবং আওয়ামী লীগ বিদ্রোহী (স্বতন্ত্র) প্রার্থী এস এম কাইয়ুম (মোবাইল ফোন)।

নির্বাচনে মেয়র পদে আওয়ামী লীগ-বিএনপি ও বিদ্রোহীদের নিয়ে ত্রিমুখী লড়াই জমে উঠেছে।  যদিও মেয়র পদের ৪ জন প্রার্থীই ছুটছেন ভোটারদের দ্বারে দ্বারে।  তবুও ভোটের মাঠে মূল আলোচনায় রয়েছেন আওয়ামী লীগের আমজাদ হোসেন বাচ্চু (নৌকা), বিএনপির হারুণ অর রশিদ (ধানের শীষ) এবং আওয়ামী লীগ বিদ্রোহী (স্বতন্ত্র) প্রার্থী এস এম কাইয়ুম (মোবাইল ফোন)।

এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী বাছাইয়ে নানা নাটকীয়তার সাক্ষী হয়েছেন পৌরবাসী। দীর্ঘদিন ধরেই নরসিংদীতে ক্ষমতাশীন আওয়ামী লীগের দুটি ধারায় বিভক্ত ছিল। যার একটি নেতৃত্ব দেন নরসিংদী-১ (সদর) আসনের এমপি, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মো: নজরুল ইসলাম হীরু (বীরপ্রতিক)। আর অন্যটির জেলা পরিষদর চেয়ারম্যান, জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবদুল মতিন ভূইয়া। আর এই বিভক্তির জন্যই দু’জনকেই দলীয় পদ থেকে অব্যাহতি দেন দলটির কেন্দ্রিয় কমিটি। পৌর নির্বাচনে বর্তমান মেয়র  মতিন গ্রুপের নেতৃত্বে থাকা নরসিংদী শহর আওয়ামী সভাপতি কামরুজ্জামান কামরুলকে দলীয় মনোনয়ন কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ প্রথমে শহর যুবলীগের সাবেক সভাপতি আশরাফুল ইসলাম সরকারকে দলের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা চমক সৃষ্টি করে। কিন্তু একদিন পরেই তা প্রত্যাহার করে নতুন প্রার্থী  দেয় পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আমজাদ হোসেন বাচ্চুকে। ফলে এমপি হীরু গ্রুপের এস এম কাইয়ুম স্বতন্ত্র (আওয়ামী লীগ বিদ্রোহী) হিসেবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্ধিতা করে।

স্থানীয় কয়েক রাজনীতিবীদদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দলীয় মনোনয়ন নিয়ে আওয়ামী লীগের এমন পরিস্থিতিতে নতুন করে হিসাব কষতে শুরু করেছেন সাধারণ ভোটাররা। অতীতে প্রায় সব নির্বাচনে আওয়ামী লীগ-বিএনপির দ্বিমুখী লড়াই হলেও এবার বড় দুই দলে হবে ত্রিমুখী লড়াই।

ভোটের মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন মেয়র প্রার্থীরা। থেমে নেই কাউন্সিলর প্রার্থীরাও।  তারা ভোটারদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে ভোট প্রার্থণা করছেন।  তবে ভোটাররা বলছেন, শেষ মুহূর্তে এসে লড়াই গড়াচ্ছে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীর মধ্যে।

নৌকা প্রতিক নিয়ে প্রতিদ্বন্ধি প্রার্থী নরসিংদী শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদ আমজাদ হোসেন বাচ্চু পৌর মেয়র কামরুজ্জামান কামরুলের বিশ্বস্ত সহচর হিসেবেই সবাই জানেন। যার সর্বশেষ প্রমান মেলে আওয়ামী লীগ দলীয় মনোনয়ন পাওয়া থেকে। মেয়র কামরুল নিজে মনোনয়ন বঞ্চিত হয়ে। দৌড়-ঝাপ, লবিং তদবির করে আমজাদ হোসেন বাচ্চু’র পক্ষে মনোনয়ন নিয়ে আসেন। দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতিতে সম্পৃক্ত থাকলেও আমজাদ হোসেন বাচ্চু মেয়র কামরুলের হাত ধরে শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের পদটি পাওয়ার পরই রাজনীতিরি সামনের সারিতে চলে আসেন। যার সব কৃতিত্ব মেয়র কামরুলের।

নরসিংদী-১ (সদর) আসনের পর পর চারবার নির্বাচিত প্রয়াত জনপ্রিয় সাংসদ সামসুদ্দিন আহমেদ এছাকের জেষ্ঠ্য পুত্র হারুণ অর রশিদ হারুণ। তিনি ধানের শীষ প্রতিক নিয়ে নিরআবচনে প্রতিদ্বন্ধি করছেন। নরসিংদী জেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত থেকে নরসিংদী সাধারণ মানুষের সেবা করে যাচ্ছেন। সৎ, ন্যায়-নিষ্ঠাবান ও স্বদালাপী ব্যক্তি হিসেবে হারুণ অর রশিদের সর্বমহলে ব্যাপক গ্রহণ যোগ্যতা রয়েছে।

তারুণ্যের অহংকার হিসেবে পরিচিত এসএম কাইয়ুম নরসিংদী একজন জনপ্রিয় সাবেক ছাত্রনেতা। ব্যাপক জনপ্রিয়তায় তিনি নরসিংদী সরকারী কলেজ ছাত্র সংসদের জিএস নির্বাচিত হওয়ার পর রাজনীতিতে তার উথ্থান শুরু। এরপর তাকে আর ফিছনে তাকাতে হয়নি। তিনি বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সহ সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন। বর্তমানে নরসিংদী জেলা আওয়ামী লীগের শিক্ষা বিষয়ক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করা সদা হাস্যোজ্জ্বল তরুন এই নেতা সমাজের সকল স্তরের মানুষের কাছে  রয়েছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা।

ইসলামী আলোন্দল, বাংলাদেশের নরসিংদী পৌর শাখার সাশারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামন আহাদ হাত পাখা প্রতিকে মেয়র পদে প্রার্থী হয়ে ভোটারদের কাছে ভোট প্রার।থণা করে যাচ্ছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছে নরসিংদী পৌরসভার মেয়র পদটি দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের দখলে ছিল। এই ধারাহিকতা অব্যহত রাখতে গ্রুপিংকে প্রাধান্য না দিয়ে দলীয় স্বার্থে সকল নেতা কর্মী এক হয়ে আমজাদ হোসেনের নৌকার পক্ষে কাজ করতে হবে। অপরদিকে মোবাইল প্রতিক নিয়ে  আওয়ামী লীগ বিদ্রোহ প্রার্থী এস এম কাইয়ুমের রয়েছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা। জনপ্রিয় এই ছাত্রনেতা বিগত পৌর নির্বাচনেও তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে ভোটরদের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিলেন। ভোট যুদ্ধে তার মোবাইল প্রতিক জযী হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায়না। এদিকে এবারের নির্বাচনে  দলীয় প্রার্থী বাছাই ব্যাপক নাটকীয়তা ও দলের বিদ্রোহী প্রার্থী থাকায়  এই সুযোগ প্রতিষ্ঠা  করতে চাঙ্গা বিএনপি।  তাছাড়া বিএনপি প্রার্থী হারুণ অর রশিদের পিতা সামসু উদ্দিন আহমেদ এছাক নরসিংদী সদর আসনে পর পর চারবার এসপি নির্বাচিত হন। নরসিংদীর গণ মানুষের নেতা হিসেবে তিনি সমাদৃত ছিলেন। মরহুম পিতার জনপ্রিয়তা নিজের ব্যক্তিগত ইমেজ এই দুয়ের সম্বনয়ে ধানে শীষ প্রতিক নিয়ে হারুণ রশিদ নির্বাচিত হলে অবাক হওয়ার কিছু নেই।  তবে এবারে পৌর নির্বাচনকে নরসিংদী জেলা আওয়ামী লীগের বিবাধমান দুই গ্রুপের জন্য মর্যাদা ও অস্তিত্বের লড়াই অনেককেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা ।

এদিকে দলীয় প্রার্থী হারণ অর রশিদের জয়ের সম্ভাবনা জাগায় বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও জেলা বিএনপিএনপির সভাপতি খায়রুল কবির খোকনসহ জেলা পর্যায়ের বিএনপি এবং সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতা কর্মীরা এক যোগে প্রচারণায় কাজ করছেন।

ভোটের মাঠের পরিস্থিতি সম্পর্কে নৌকা প্রতিক নিয়ে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী আমজাদ হোসেন বাচ্চু  বলেন, তিনি ভোটারদের কাছে যাচ্ছেন, ভোটাও উন্নয়নের পক্ষে নৌকায় ভোট দেওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করছেন। তিনি নির্বাচিত হলে বর্তমান মেয়াদের অসম্পূর্ণ কাজগুলোকে সম্পূর্ণ করবেন।

ধানের শীষ প্রতিক বিএনপি দলীয় প্রার্থী হারুণ অর রশিদ বলেন, এখনও পর্যন্ত ভোটের পরিবেশ স্বাভাবিক রয়েছে। কোথাও বাধার সম্মখিন হয়নি। তবে ভোটার মাঝে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে কিনা সে বিষয়ে সংশয় রয়েছে। আমরা চাই সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মধ্যদিয়ে যিনিই বিজয়ী আমি তাকে বরণ করে নিতে কুণ্ঠিত হবনা।

মোবাইল প্রতিক নিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী এস এম কাইয়ুম বলেন, নৌকা প্রতিক নিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী আমজাদ হোসেন বাচ্চু ও তার সমর্থকরা ইতোমধ্যে পেশী শক্তি ব্যবহার করতে শুরু করেছে। গত ৩/৪ দিনে তারা আমার বেশ কয়েকটি নির্বাচনী ক্যাম্প ভাঙ্গচুরসহ পোস্টার ছেড়া ও কর্মীদের উপর হামলার ঘটনা ঘটিয়েছে। এছাড়াও আমার কর্মী-সমর্থকদের বিভিন্ন ধরণের ভয়-ভীতি প্রদর্শণ করছে।

জেলা রিটার্ণিং অফিসারের কার্যালয় সূত্রে জানা যায়,  নরসিংদী পৌরসভার নির্বাচনের এবার মোট ভোটার সংখ্যা ৯৯ হাজার ৪৫৪। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৪৯ হাজার ১৫৭ এবং মহিলা ভোটার ৫০ হাজার ২২৭ জন। নির্বাচনে ৯ টি সাধারণ ওয়ার্ডে  ৪০ টি ভোট কেন্দ্রের ২৭৮টি স্থায়ী এবং  ৮ টি অস্থায়ী ভোটকক্ষে ভোট গ্রহন করা হবে। নির্বচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে সকল প্রকার প্রস্তুতি নিবে নির্বাচন কমিশন।

জেলা রিটার্ণিং অফিসার ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) কমল কুমার ঘোষ নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ করতে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে সকল ব্যবস্থা গ্রহণ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

নরসিংদী পৌরবাসী শান্তিপূর্ণ পরিবেশে একটি সুষ্ঠু, সুন্দর ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে তাদের পৌর পিতা বেছে নিতে চায়। সেই লক্ষে ভোটের স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে দিতে নির্বাচন কমিশনের প্রতি  আহবান জানিয়েছে পৌরবাসী।

(এসএইচআর/এসএএম/৬ ফেব্রুয়ারী ২০২১ইং)

Short URL: https://biniyougbarta.com/?p=136892

সর্বশেষ খবর