Responsive image

সঠিক নীতিসহায়তা স্থানীয় অটোমোবাইল শিল্পের উন্নয়নকে তরান্বিত করবে

নিজস্ব প্রতিবেদক, বিনিয়োগবার্তা: সঠিক নীতিসহায়তা, প্রণোদনা ও কর সুবিধা স্থানীয় অটোমোবাইল শিল্পের উন্নয়নকে তরান্বিত করবে বলে মনে করেন এ শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তা ও বিশেষজ্ঞরা।

রোববার (১৮ এপ্রিল, ২০২১) ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত ‘অটোমোবাইল শিল্পের উন্নয়ন : বর্তমান বাস্তবতা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা’ শীর্ষক ওয়েবিনারে এ মন্তব্য করেন তারা।

শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহ্মুদ হুমায়ুন, এমপি ওয়েবিনারে প্রধান অতিথি এবং বাংলাদেশে নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত ইতো নায়োকি সম্মানিত অতিথি হিসেবে যোগদান করেন।

ওয়েবিনারের স্বাগত বক্তব্যে ঢাকা চেম্বারের সভাপতি রিজওয়ান রাহমান বলেন, আমাদের অটোমোবাইল শিল্পে মূলত আমদানি নির্ভর রিকন্ডিশন গাড়ীর প্রধানই বেশি, তবে জাপান, চীন ও ভারত থেকে কিছু নতুন গাড়ীও আমদানি করা হয়, যার সংখ্যা তেমন উল্লেখযোগ্য নয়।

ডিসিসিআই সভাপতি জানান, কোভিড পূর্ববর্তী সময়ে দেশের এ শিল্পখাত প্রতিবছর গড়ে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেলেও, বিআরটিএ তথ্য মতে ২০২০ সালে বাংলাদেশে মটর ভিহাইক্যালের নিবন্ধন কমেছে প্রায় ২৪%।

তিনি আরো বলেন, দীর্ঘমেয়াদী নীতিমালায় অভাব, সহায়ক  শুল্ক কাঠামো না থাকা, স্থানীয়ভাবে পর্যাপ্ত কাঁচামালের যোগান না থাকা, দক্ষ মানবসম্পদ ও বেকওয়ার্ড লিংকেজ খাতের  অনুপস্থিতির কারণে আমাদের অটোমোবাইল শিল্পে কাঙ্খিত প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব হচ্ছে না।

তিনি উল্লেখ করেন, এখাতের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর জন্য শিল্পমন্ত্রণালয় ১০ বছর মেয়াদী ‘বাংলাদেশ অটোমোবাইল সেক্টর রোডম্যাপ ২০২১-২২’ এবং ‘অটোমোবাইল-ম্যানুফেকচারিং ডেভেলপমেন্ট পলিসি’-এর খসড়া প্রস্তুুত করেছে, যা দ্রæততম সময়ের মধ্যে চড়ান্তকরণ করা একান্ত অপরিহার্য। পাশাপাশি গাড়ী নির্মাণের জন্য ব্যবহৃত যন্ত্রাংশ তৈরিতে স্থানীয় শিল্পের বিকাশের জন্য যৌথ বিনিয়োগ উৎসাহিতকরণ, কমপক্ষে ৫-১০ বছর মেয়াদী সহায়ক শুল্ক নীতিমালা প্রদান, প্রবাসী বাংলাদেশীদের এখাতে বিনিয়োগে উৎসাহিত করার জন্য ৫বছরের কর অব্যাহতি প্রদান এবং এখাতের গবেষণা কার্যক্রমকে উৎসাহিত ও প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিতকল্পে ‘জাতীয় অটোমোবাইল কাউন্সিল’ এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে ‘জাতীয় অটোমোবাইল স্কিলস ডেভেলপমেন্ট কাউন্সিল’ স্থাপনের প্রস্তাব করেন।

প্রধান অতিথি’র বক্তব্যে শিল্পমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকারের সুদক্ষ নেতৃত্বের কারণে বাংলাদেশ আগামী ২০২৬ সাল স্বল্পন্নোত দেশ হতে উন্নত দেশে পরিণত হবে।

তিনি জানান, বর্তমানে আমাদের মাথাপিছু গড় আয় প্রায় ২ হাজার ৬৪ মার্কিন ডলার এবং আশা প্রকাশ করেন, সামনের দিনগুলোতে তা আরো বৃদ্ধি পাবে, যার ফলে দেশের মানুষের মাঝে নিরাপদ যোগাযোগ মাধ্যম হিসেবে ব্যক্তিগত গাড়ীর পাশাপাশি আধুনিক সুবিধা সম্বলিত যানবাহন ব্যবহারের প্রবণতা বাড়বে, যেটি অটোমোবাইল খাতের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। তিনি জানান, এখাতের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর জন্য একটি সহায়ক নীতিমালার খসড়া প্রস্তুুতের কাজ করছে শিল্প মন্ত্রণালয়, যেটি দ্রæততম সময়ের মধ্যে চুড়ান্ত করা হবে। পাশাপাশি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল সমূহে এখাতের যন্ত্রাংশ উৎপাদনে শিল্প-কারখানা স্থাপনে এগিয়ে আসার জন্য দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তাদের প্রতি আহŸান জানান শিল্পমন্ত্রী। অটোমোবাইল খাতের সার্বিক উন্নয়নে গবেষণা কার্যক্রম একান্ত অপরিহার্য উল্লেখ করে বলেন, এ লক্ষ্যে শিল্প ও শিক্ষা খাতের সমন্বয় খুবই জরুরী।

সম্মানিত অতিথি’র বক্তব্যে জাপানের রাষ্ট্রদূত রাষ্ট্রদূত ইতো নায়োকি বলেন, অনেক দেশের শিল্পায়নে অটোমোবাইল খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে, বিশেষকরে জাপানে এখাত দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে অটোমোবাইল শিল্প উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করছে এবং বাংলাদেশের সেই উদাহরণ অনুসরণের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন। এলক্ষ্যে একটি সমন্বিত নীতিমালা অপরিহার্য বলে তিনি মত প্রকাশ করেন এবং সেই সাথে সরকারী ও বেসরকারীখাত একযোগে কাজ করার আহŸান জানান। রাষ্ট্রদূত বলেন, বাংলাদেশের অটোমোবইল খাতের বিকাশকে ত্বরান্তিত করতে হালকা প্রকৌশল শিল্পকে এগিয়ে আসতে হবে। তিনি উল্লেখ করেন, জাপানের গাড়ী নির্মাতা প্রতিষ্ঠান মিতসুবিশি  বাংলাদেশে ‘সিকেডি প্ল্যান্ট’ স্থাপনের আগ্রহ দেখিয়েছে এবং এ বিষয়ক সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের প্রক্রিয়া চলমান আছে। তিনি অটোমোবাইল খাতের উন্নয়নে স্থানীয় হালকা প্রকৌশল শিল্পের বিকাশ একান্ত অপরিহার্য বলে মত প্রকাশ করেন।

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইফাদ গ্রুপ অব বাংলাদেশ-এর উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাসকিন আহমেদ।

মূল প্রবন্ধে তিনি বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ অবকাঠামো খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি লাভ করছে এবং বিশেষকরে পদ্মা সেতু পুরোদমে চালু হলে স্থানীয় পর্যায়ে বাণিজ্যিক যানবাহনের চাহিদা বৃদ্ধির ভালো সম্ভাবনা রয়েছে।

তিনি আশা প্রকাশ করেন, ‘বিবিআইএন মটর ভিহাইক্যাল এগ্রিমেন্ট’-এর কারণে এ অঞ্চলে বাণিজ্যিক যানবাহনের চাহিদাও বাড়বে। তিনি উল্লেখ করেন, এখাতে মোট বিনিয়োগ প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা, জিডিপিতে যার অবদান ০.৫%। তিনি বলেন, আমাদের ব্যবহৃত গাড়ীর মধ্যে ৫০% গাড়ীই রিকন্ডিশন এবং নতুন গাড়ী সংখ্যা হলো ৫%।

তিনি বলেন, খসড়া আটোমোবাইল নীতিমালায় সরকার ব্যবহৃত গাড়ী আমদানির উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের পরিকল্পনা নিয়েছে, যা আমাদের স্থানীয় অটোমোবাইল খাতের সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তাসকিন আহমেদ আরো বলেন, আমাদের দেশে বাণিজ্যিক গাড়ীর বাজার প্রায় ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং সামনের দিনগুলোতে এ বাজারের বৃদ্ধির আরো সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাতে অটোপার্টস-এর বাজার প্রায় ১৪০০ কোটি টাকা এবং বার্ষিক এ খাতের প্রবৃদ্ধির হার প্রায় ১২%।

ওয়েবিনারের নির্ধারিত আলোচনায় বাংলাদেশস্থ মার্কিন দূতাবাসের ইকোনোমিক অ্যান্ড ইন্দো-প্যাসিফিক অ্যাফেয়ার্স ইউনিট-এর প্রধান জন ডি ডানহাম, প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোঃ তৌহিদুজ্জামান, উত্তরা গ্রুপ অব কোম্পানীজ-এর চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাতিউর রহমান এবং বারভিডা’র সভাপতি আব্দুল হক প্রমুখ অংশগ্রহণ করেন।

মাতিউর রহমান বলেন, দেশের অবকাঠামো উন্নয়নের কারণে অটোমোবাইল খাতের উন্নয়নের প্রচুর সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে এবং স্থানীয় উদ্যোক্তাদের সাথে পর্যালোচনার মাধ্যমে খসড়া অটোমোবাইল নীতিমালা বাস্তাবয়নের আহবান জানান। এছাড়াও তিনি অটোমোবাইল খাতের শিল্পায়নকে আরো সম্প্রসারণের লক্ষ্যে সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসার জোরারোপ করেন।

মোঃ তৌহিদুজ্জামান বলেন, সিবিও ভিহাইক্যালের মাধ্যমে আমাদের দেশের যানবাহনের চাহিদা মেটানো হয়, তবে আমাদের লক্ষ্য হলো নিজস্ব গাড়ির ব্রান্ড তৈরি করা। তিনি জানান, আমরা বর্তমানের এ্যাসেম্বেলিং হতে প্রগ্রোসিভ ম্যানুফেকচার্স হিসেবে রপান্তরিত হতে যাচ্ছি, এজন্য খুচড়া যন্ত্রপাতি তৈরির জন্য নিজস্ব সক্ষমতা বাড়াতে হবে, পাশপাশি গবেষণা কার্যক্রম বাড়নোর উপর জোরারোপ করেন।

বারভিডা’র সভাপতি আব্দুল হক বলেন, অটোমোবাইল খাতের বিকাশে আমাদের নিজস্ব বাজার তৈরিই বড় চ্যালেঞ্জ এবং নিজস্ব বাজার সম্প্রসারণে সরকার কে সহায়তা প্রদানের পাশাপাশি  শিল্পমন্ত্রণালয় কে এব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। তিনি এখাতে বিদেশি বিনিয়োগকে স্বাগত জানান। তিনি বলেন, গাড়ী আমদানিতে আমাদেরকে ১২০% ট্যাক্স দিতে হয়, যার জন্য আমদানিকৃত গাড়ির মূল্য পাওয়ায়, স্থানীয় বাজারে চাহিদা আশানুরূাপভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে না। তিনি এখাতের বিকাশে দীর্ঘমেয়াদী নীতি সহায়তা প্রদান একান্ত অপরিহার্য বলে মত প্রকাশ করেন। সৈয়দ ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, গাড়ীতের ব্যবহৃত ‘ইলেকট্রেনিক কন্ট্রোল ইউনিট (ইসিইউ)’ উৎপাদনে ও এটি ব্যবহারের সফটওয়্যার তৈরিতে দক্ষ মানব সম্পদের জন্য বাংলাদেশকে এগিয়ে আসার আহবান জানান এবং এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়কে সহায়তা প্রদানে সরকারকে সহযোগিতার প্রদানের জোরারোপ করেন।

জাইকা প্রতিনিধি হায়াকাহ ইউকো বলেন, এখাতের মাধ্যমে প্রচুর মানুষেরে কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে, যা অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। এজন্য তিনি বাংলাদেশ সরকারকে একটি যুগোপযোগী নীতিমালা প্রণয়ন, বিনিয়োগ প্রণোদান ও ট্যাক্স সহায়তা প্রদান, স্থানীয় উৎপাদানকারীর সক্ষমতা বাড়ানো এবং স্থানীয় চাহিদা বাড়ানোর উপর জোরারোপ করেন।

জন ডি ডানহাম বলেন, এখাতের সাথে সম্পর্কিত ক্ষুদ্র ও মাঝারী কারখানাসমূহকে সহায়তা প্রদান করতে হবে। তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতির গতিধারা বজায়ে রাখতে হবে রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণের কোন বিকল্প নেই এবং এক্ষেত্রে তথ্য-প্রযুক্তি ও অটোমোবাইল খাত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।

ডিসিসিআই ঊর্ধ্বতন সহ-সভাপতি এন কে এ মবিন, এফসিএস, এফসিএ ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। ডিসিসিআই সহ-সভাপতি মনোয়ার হোসেনসহ পরিচালনা পর্ষদের সদস্যবৃন্দ ওয়েবিনারে যোগদান করেন।

(এসএএম/১৮ এপ্রিল ২০২১)

Short URL: https://biniyougbarta.com/?p=142415

সর্বশেষ খবর