Responsive image

মানসম্মত শিক্ষার স্বরূপ      

ড. মিহির কুমার রায়: শিক্ষা নিয়ে ভাবনার শেষ নেই জীবনের সর্ব পর্যায়ে যা হলো একটি মনোজাগতিক প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি জন্মগ্রহণের পর থেকে আমৃত্যু পর্যন্ত তার মানব উন্নয়নের অংশ হিসেবে শিক্ষাকে কাছে পেয়ে থাকে যা অ-প্রাতিষ্ঠানিক কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক উভয় পর্যায়েই বিরাজমান। এই শিক্ষাকে বিজ্ঞানীরা বিভিন্নভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন যার অর্থ দার্শনিকের মতে জীবনবোধের উন্নয়ন যেখানে নৈতিক মূল্যবোধই বিবেচ্য বিষয় উজ্জীবিত মানুষ তৈরির এক মায়াপুর। আবার অর্থনীতিবিদরা বলছেন মানবীয় পুঁজিতে বিনিয়োগ হলো সর্বোৎকৃষ্ট বিনিয়োগ খাত যার মধ্যে রয়েছে শিক্ষা অর্জন ও প্রশিক্ষণ প্রক্রিয়া যা অধ্যাপক টি.ডব্লিউ. সোজ, অর্থনীতির শিক্ষক, শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, অনেক বছর আগেই তার প্রখ্যাত গ্রন্থ’ Transforming Traditional Argiculture এবং এ.টি মোশার তার প্রখ্যাত গ্রন্থ Getting Agriculture Moving-এ কথাগুলো বলে গেছেন। যার দার্শনিক অর্থ দাঁড়ায় কেউ যদি পর্যাপ্ত সম্পদের (অর্থনৈতিক, প্রাকৃতিক) মালিক হন তা হলে সেগুলোর ব্যবস্থাপনার জন্য অনেক লোকবলের প্রয়োজন হয় কিন্ত যদি কেউ পর্যাপ্ত জ্ঞানী কিংবা জ্ঞানের অধিকারী হন তাহলে জ্ঞানের আলোই তাকে পাহারা দিয়ে রাখবে যার কোন ক্ষয় নেই কিংবা সংরক্ষণের জন্য বাড়তি পাহারাদারের প্রয়োজন হবে না।

কিন্তু আমাদের চতুর্পাশে যে ভোগবাদী সমাজ ব্যবস্থা তাতে কোনটি বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে? নিশ্চয়ই দ্বিতীয়টি নয়। তা হলে আমরা কি আলোর পথে যাত্রী না আঁধারের পথে যাত্রী? প্রাথমিক পর্যায়ে পূর্বেকার শিক্ষায় একটি বই ছিল বাল্যশিক্ষা যার প্রতিটি বাক্যই ছিল শিক্ষার্থীর মানবীয় মূলধন ও চরিত্র গঠনের একটি বড় হাতিয়ার যেমন- ‘সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি আমি যেন সারাদিন ভালো হয়ে চলি’, কিংবা ‘পাখি সব করে রব রাতি পোহাইলো কাননে কুসুমকলি সকলি ফুটিল, রাখাল গরু নিয়ে যায় মাঠে শিক্ষকগণ দেয় মন নিজ নিজ পাঠে ইত্যাদি। বর্তমান প্রেক্ষাপটে সেই বিষয়গুলো আর দেখা যায় না এবং এখন এসেছে নতুন নতুন পাঠন-পঠন যা মানবীয় মূলধন তৈরির চেয়ে ভালো ফলাফল তৈরিতে প্রাধান্য পায়। বয়স অনুপাতে পড়ার ব্যাপ্তি অনেক ব্যাপক হয়েছে। এসব কারণে পঠনের চাপ আর অভিভাবকের নজরদারি দুটিতে কোমলমতি ছাত্ররা পড়ে বিপাকে। আবার শিক্ষা পদ্ধতিতে আসছে আধুনিকায়ন প্রযুক্তি নির্ভরতা যা কোন ভাবেই শিক্ষার্থীর মানবিক পুঁজি বিকাশে সহায়ক নয়।

এ ব্যাপারে সরকারের প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় তাদের প্রশাসনিক কাঠামোতে সার্বিক প্রাথমিক শিক্ষার পাঠন তৈরি ও শিক্ষক প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাপনায় তাদের বিধিবদ্ধ দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে একেবারে অবৈতনিক ভাবে। এরি ধারাবাহিকতায় ছাত্ররা প্রাথমিক স্থরেই পঞ্চম শ্রেণীর সমাপনী পরীক্ষায় আবার অষ্টম শ্রেণীতে আরও একটি সমাপনী পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে মাধ্যমিক পর্যায়ের উপনীত হয়। এ বিভিন্ন পর্যায়ের বোর্ড কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষায় অংশগ্রহণের ফলে শিক্ষার্থীরা হয়ে উঠেছে পরীক্ষামুখী (result oriented), জ্ঞানমুখী (knowledge oriented) নয়। এর একটি বড় কারণ হলো শিক্ষার্থী অনেক ক্ষেত্রে Text Book নির্ভর না হয়ে Note Book নির্ভর যার ফলে পরীক্ষার জন্য যুতটুকু দরকার ততটুকুর মধ্যেই লেখাপড়া সীমাবদ্ধ রয়ে যাচ্ছে বিধায় জ্ঞানের ভিত্তি তৈরি হচ্ছে না। আবার শ্রেণীভিত্তিক পাঠদান পূর্বেকার আর বর্তমানের মধ্যে অনেক পার্থক্য লক্ষণীয়। আগে শ্রেণীকক্ষই ছিল শিক্ষার্থীর শিক্ষার মূল ক্ষেত্র আর শিক্ষক ছিল তার পথ প্রদর্শক কিন্তু বর্তমানে শ্রেণীকক্ষভিত্তিক শিক্ষার পাঠদানে ঘাটতি থাকায় শিক্ষকরাই মূলত দায়ী বলে প্রতীয়মান হলেও শিক্ষার্থী কিংবা তাদের অভিভাবকরাও দায় এড়াতে পারে না। এই ঘাটতি পূরণের জন্য সামর্থ্যবান শিক্ষার্থীকে ছোটতে হয় কোচিং কেন্দ্রে যেগুলো স্কুলের শিক্ষক দ্বারাই পরিচালিত এক লাভজনক বাণিজ্য যা অনেকাংশে ব্যয়বহুল, নীতি বিবর্জিত ও শিক্ষার আদর্শ যাকে বলা হয় ‘শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড’ এর সঙ্গে সংঘার্ষিক। আর মজার বিষয় যে, সেই সব নির্ধারিত শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার প্রশ্ন বলে দেয়া তথা স্কুলের বেশি নম্বর পাইয়ে দেয়ার ব্যাপারে তারা সদাই যত্নবান থাকে। পক্ষান্তরে যারা এসব বিকল্প শিক্ষা কেন্দ্র কর্তৃক পরিচালিত কোচিংয়ে সাড়া দেয় না তারা ভালো ছাত্রছাত্রী হওয়া সত্ত্বেও ফলাফলের গ্রেডিংয়ে পিছিয়ে যায়। আবার কোচিংধারী শিক্ষার্থীরা একটি কৃত্রিম ফলাফলের স্বপ্নে বিভোর হয়ে পরবর্তীতে পাবলিক পরীক্ষাগুলোতে আর গ্রহণযোগ্য সম্মানজনক ফলাফল পেতে সক্ষম হয় না। তাহলে সে সব শিক্ষার্থীর অভিভাবকরা কেনই বা এ ধরনের মরণ ফাঁদে পা দিয়ে তাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ জীবন বিপন্ন করছেন তা কি একবার ভেবে দেখেছেন? আবার সরকার মনে করছে সেই সব কোচিং সেন্টার হলো প্রশ্ন ফাঁসের প্রজনন কেন্দ্র যা এখন একটি জাতীয় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এ নিয়ে প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. জাফর ইকবাল কতই না মিডিয়াতে লেখালেখি করেছেন এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে জবাবের কাঠগড়ায় দাঁড়া করিয়েছেন। এর অন্তরালে বাণিজ্য চলে কোটি টাকার। আবার যখন ভর্তির প্রশ্ন আসে কোন একটি নামিদামি সরকারি/বেসরকারি স্কুল, কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে তখন আবার শুরু হয় ভর্তির নামে কোচিং বাণিজ্য যেখানে শিক্ষার্থীর সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে অভিভাবকসহ ভর্তি ইচ্ছুক আত্মীয়স্বজন, শুরু হয়ে যায় প্রশ্ন ফাঁসের আবার মহড়া যা গত এক যুগ ধরেই দেখা যাচ্ছে দেশের সর্বপর্যায়ের পবিত্র শিক্ষাঙ্গনগুলোতে হোক সেটা প্রাথমিক, মাধ্যমিক কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে। এর ফলশ্রুতিতে শিক্ষার্থীরা হয়ে যাচ্ছে শিক্ষা বিমুখ আর নকল প্রবণতার প্রতি আসক্ত যা আগামী প্রজন্মের জন্য একটি অশুভ সংকেত। এ কাজগুলোতে শিক্ষার্থীর চেয়ে তাদের অভিভাবকরাই বেশি আগ্রহী হয়ে ওঠেন, যেনতেনভাবে বিভিন্ন পর্যায়ের ভর্তির সুযোগ নিতেই হবে।

এখন প্রশ্ন উঠেছে- খোদ পাবলিক স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি কার্যক্রম, প্রশাসন, শিক্ষক, ছাত্র, রাজনৈতিক নেতাদের নৈতিকতা নিয়ে যেখানে আগামী প্রজন্মকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর শিক্ষা দেয়ার কথা সেখানে হচ্ছে তার বিপরীত কাজ। এমন একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যখন শিক্ষা কার্যক্রম শেষ করে, যখন কোন ডিগ্রিধারী প্রশিক্ষিত প্রার্থী চাকরির দুয়ারে হাজির হয় তখন সম্মুখীন হয় আরও একটি চ্যালেঞ্জের তা হলো সরকারি চাকরির নির্বাচনী পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা। এর ছোবল থেকে শিক্ষা ব্যবস্থাকে রক্ষা করার জন্য শিক্ষামন্ত্রীর উদ্যোগের কোন ঘাটতি নেই। বিশেষত রাজনৈতিক কারণ না হলে খরচপাতি ছাড়া আর কোন গতি থাকে না। আবার সঙ্গে সঙ্গে সরকার কোচিং বাণিজ্যের ওপরও নিষেধাজ্ঞার কাজ শুরু করলে তা নিয়েও সংশয় রয়েছে।

এখন আসা যাক মানসম্মত শিক্ষা নিয়ে যা অনেকে বলেন সময়ের দাবি। আবার টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য-৪ এ সবার জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমাজভিত্তিক শিক্ষা নিশ্চিতকরণ ও জীবনব্যাপী শিক্ষা লাভের সুযোগ সৃষ্টির কথা বলা হয়েছে। এখন এর বাস্তবায়নের জন্য শিক্ষার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্থর খুবই গুরুত্বপূর্ণ যেখানে শিক্ষার্থীর ভিত্তি স্থাপিত হয়। এ প্রক্রিয়ায় শিক্ষকের ভূমিকাই প্রাধান্য পাবে। আগেকার সময়ে মফস্বলের স্কুলগুলো থেকেই ভালো ফলাফল আসত শুধু শিক্ষকের পড়াশোনার পাশাপাশি কঠোর নজরদারির কারণে। এখন তারা নিজেদের গৃহস্থালির চাষাবাদ সেরে তারপর স্কুলে যান এবং এগুলো দেখারও কেউ নেই। প্রায়শই খবর আসে মাধ্যমিক সরকারি স্কুলগুলোতে শিক্ষকের অনুপস্থিতির কথা এবং বৃহদাকার কোচিং বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা। আবার ফলাফলের বিচারে শহর থেকে গ্রামের স্কুলগুলো পিছিয়ে পড়েছে অবস্থানগত কারণে কেবল যোগ্য শিক্ষকের অভাবে। তাহলে যোগ্য শিক্ষক ছাড়া মানসম্মত শিক্ষা কিভাবে সম্ভব হবে? শিক্ষা নীতি ২০১০ তে বলা হয়েছে- ‘সর্বক্ষেত্রে মানসম্মত উচ্চ শিক্ষা নিশ্চিত করা এবং শিক্ষার্থীদের গবেষণায় উৎসাহী করা এবং মৌলিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের গবেষণার সঙ্গে সঙ্গে দেশের জন্য প্রয়োজনীয় গবেষণার উপযুক্ত পরিবেশ গড়ে তোলা।’

এখন প্রশ্ন হলো, মানসম্মত শিক্ষা দিতে হলে গবেষণাকে এর সঙ্গে যুক্ত করতে হবে বিশেষত কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে যার জন্য পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ অপরিহার্য। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো সর্বোচ্চ বিদ্যাপিঠেও মোট বাজেটের দশ ভাগও গবেষণার জন্য বরাদ্দ রাখা হয় না। আবার গবেষনায় আগ্রহী উদ্যোগী শিক্ষকের সংখ্যাও খুবই সীমিত যা একটি আশঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি খবরাখবরে দেখা যায় যে, বিশ্বের র্যাংকিং এ স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় এই উপমহাদেশ কিংবা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কোন বিশ্ববিদ্যালয় নেই। আবার আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে বিশ্বের পাঁচশ’ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ভারতের কোন স্থান নেই। এই পরিস্থিতিতে দেশটির প্রধানমন্ত্রী ক্ষুব্ধ হয়ে গবেষণার ব্যয় নির্বাহের জন্য মোটা অংকের রুপির ঘোষণা দিয়েছেন যাতে আগামী ৫ বছরের মধ্যে অবস্থার উন্নতি হয়। উচ্চ শিক্ষায় বিশেষত বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের কার্যক্রমের লক্ষ্য মূলত শিক্ষা-গবেষণা-সম্প্রসারণ। বাংলাদেশে সরকারি পর্যায়ে ৪২টি ও বেসরকারি পর্যায়ে ৯৫টি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। এ প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ন্ত্রক হিসেবে কাজ করছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউ.জি.সি)। এই প্রতিষ্ঠানের কার্যবিধিতে শিক্ষকদের জন্য গবেষণা কার্যক্রমে সংযুক্ত হওয়া বাধ্যতামূলক থাকলেও বাস্তবে তা হয়ে উঠেছে না বিশেষত বাজেটের স্বল্পতা ও পরিবেশগত সংকটের কারণে। সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় ইউ.জি.সি উচ্চশিক্ষায় মানোন্নয়ন প্রকল্প নামে একটি কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে যা Comprehensive বলা যায়। এর ফলাফলের ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে র্যাংকিং করা হবে এবং যারা বিশেষত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এ ধাপে আশানুরূপ পর্যায়ে থাকতে ব্যর্থ হবে তাদের ক্ষেত্রে স্থায়িত্ব বজায় রাখা কঠিন হয়ে যাবে মানসম্মত ছাত্র ভর্তিতে আকর্ষণ সৃষ্টিতে।

সারা বিশ্ব এখন জ্ঞান ব্যবস্থাপনা (Knowledge Management) এবং জ্ঞান অর্থনীতি (Knowledge Economy) দেশের উন্নয়ন কৌশলে অন্যতম স্থান করে নিয়েছে বা নিতে সক্ষম হয়েছে। দেশের সপ্তম পরিকল্পনায় মানব উন্নয়ন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে সর্বোচ্চ রাখা হয়েছে এবং এরইমধ্যে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষার হারে উন্নতি সাধিত হয়েছে। কিন্তু শিক্ষার গুণগতমান, শিক্ষার বিকেন্দ্রীকরণ, মাদ্রাসা শিক্ষার আধুনিককরণ, বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষার সঙ্গে শিল্প খাতের যোগাযোগ ইত্যাদি ক্ষেত্রে প্রশ্ন রয়েছে। কারণ জাতীয় শিক্ষানীতির একটি ঘোষণা হলো- ‘দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতি সাধনের জন্য শিক্ষাকে সৃজনশীল, প্রয়োগমুখী ও উৎপাদন সহায়ক করে তোলা, শিক্ষার্থীদের বৈজ্ঞানিক দষ্টিভঙ্গি সম্পন্ন ব্যক্তিত্ব হিসেবে গড়ে তোলা এবং তাদের মধ্যে নেতৃত্বের গুণাবলী বিকাশে সহায়তা প্রদান করা।’ এই নীতি বাস্তবায়নের পথে বিভিন্ন পর্যায়ের অনেক সমস্যা রয়েছে তার মধ্যে একটি হলো ঝরে পড়া এবং তার একটা বড় প্রমাণ সম্প্রতি শুরু হওয়া জেডিসি পরীক্ষা যেখানে গতবারের তুলনায় বর্তমান বছরে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ৫ লাখ কমে যাওয়া যার একটা বড় অংশ নারী শিক্ষার্থী। তাছাড়াও সাধারণ শিক্ষার ওপর অধিকতর গুরুত্বারোপ, মানসম্মত শিক্ষকের স্বল্পতা, অপরাজনীতির বিস্তার, মাদ্রাসা শিক্ষায় বিজ্ঞানমনস্কতার অভাব ইত্যাদিতো আছেই।

আমাদের এসডিজির অনেক সাফল্য থাকলেও বয়স্ক ও আনুষ্ঠনিক শিক্ষার মধ্যে ফাঁক রয়েছে। যেমন তথ্যে দেখা যায় যে, ৩৯ শতাংশ বয়স্ক নারী এবং ৩২ শতাংশ বয়স্ক পুরুষ নিরক্ষর। আবার গ্রামীণ মহিলাদের ৪৫ শতাংশ নিরক্ষর। বিবিএসের শ্রমশক্তি জরিপ ২০১৫-১৬ অনুযায়ী ৩৩ শতাংশ শ্রমশক্তি অশিক্ষিত, ২৬ শতাংশ শুধু প্রাথমিক পর্যায়ের এবং ৩১ শতাংশ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা রয়েছে, এক-তৃতীয়াংশ অদক্ষ শ্রমশক্তি দেশে/বিদেশে শ্রম বাজারকে কুলষিত করছে। এই ধরনের পরিস্থিতিতে শিক্ষা ব্যবস্থা, শিক্ষক ও শিক্ষার্থী একটি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে। গত ২ নভেম্বর, ২০১৭ সালে কোচিং বাণিজ্য নিয়ে টেলিভিশন চ্যানেল একটি অনুষ্ঠান দেখছিলাম যেখানে ঢকার দুটি নামি-দামি স্কুল যথা ভিকারুন্নেসা নূন স্কুল ও হলিক্রস স্কুলের শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্যের চিত্র দেখে মর্মাহত হয়েছি। সরকার বেতন কাঠামোতে আমূল পরিবর্তন আনার পরও সরকারি স্কুল-কলেজগুলোতে কোচিংয়ে ছাত্রদের বাধ্য করা, শ্রেণীকক্ষে পাঠদানে শিক্ষকদের অমনোযোগিতা, চাকরির কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকা, নিয়মিত প্রতিষ্ঠানে উপস্থিত না হওয়া প্রভৃতি রুটিন কাজে পরিণত হয়েছে যা দেখে মনে হয় স্কুল/কলেজগুলোর কোন নিয়ন্ত্রক সংস্থা নেই। আবার বেসরকারি স্কুল/কলেজগুলোতে সরকার কর্তৃক নির্ধারিত ভর্তি ফির বাইরে অধিক ফি আদায়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের খবরদারি ইত্যাদি কোনটাতেই কোন কাজ হচ্ছে না। বর্ণিত অবস্থায় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার মাধ্যমে যদি দারিদ্র্য বিমোচন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সমাজ উন্নয়ন করতে হয় তাহলে প্রয়োজন। প্রথমত, শিক্ষার্থী ও অভিভাবককে বুঝতে হবে উন্নয়নে শিক্ষার গুরুত্ব কতটুকু এবং সে মাফিক ছাত্রের ওপর নজরদারি বিশেষত প্রাথমিক/মাধ্যমিক পর্যায়ে যে কোন মূল্যে নিশ্চিত করা প্রত্যেক ছাত্রের অভিভাবকের নৈতিক দায়িত্ব অর্থাৎ শিক্ষার্থী কি পড়ছে, কতটুকু বুঝে পড়ছে, বিদ্যালয়ে পড়ানো হচ্ছে কিনা, টিউটর (যদি থাকে) এর সঙ্গে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, ছাত্র-শিক্ষক-অভিভাবক মত বিনিময় ইত্যাদি।

দ্বিতীয়ত, পরিবার থেকে ছাত্রের নৈতিক মূল্যবোধ তৈরির ক্ষেত্রটির বিস্তার সাধন করতে হবে যার একটি সুদূরপ্রসারী প্রভাব রাখবে সার্বিক শিক্ষা জীবনে যেমন সদা সত্য কথা বলিবে, মিথ্যা কথা বলা মহাপাপ, শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধা, বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রতি সম্মান, নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে দৈনন্দিন কার্য পরিচালিত, প্রকৃতিনির্ভর অনুশাসনের প্রতি আসক্তি, স্বাস্থ্যের প্রতি যত্নবান ইত্যাদি। এ সময়ের একটি বিষয় লক্ষণীয় পারিবারিক পর্যায়ের যে মূল্যবোধের ও নৈতিকতার শিক্ষা যা দিয়ে তৈরি হয়ে একজন শিক্ষার্থী প্রাথমিক/মাধ্যমিক স্তরে সেটা আশানরূপ ভাবে হচ্ছে না যা অবশ্যি প্রয়োজন।

তৃতীয়ত, শিক্ষক ছাত্র একসঙ্গে শিক্ষাকে টেনে নিয়ে যাবে তাদের অভীষ্ট লক্ষ্যে কিন্তু দেশে প্রশিক্ষিত নৈতিক মানসম্পন্ন শিক্ষকের স্বল্পতা রয়েছে যার সঙ্গে আরও রয়েছে অবকাঠামোগত দুর্বলতা। প্রায়শই চ্যানেল আই এ মুস্তফা মল্লিকের উপস্থাপনায় প্রাথমিক/মাধ্যমিক পর্যায়ের স্কুল, শিক্ষক ও শিক্ষার ব্যবস্থার চিত্র দেখা যায় যা অনেক ক্ষেত্রে বেদনাদায়ক ও মর্মস্পর্শী। স্কুল/কলেজে শিক্ষক আছে, পর্যাপ্ত অবকাঠামোও আছে কিন্তু পাবলিক পরীক্ষায় (এসএসসি/এইচএসসি) একজনও উত্তীর্ণ হতে সক্ষম হয়নি। আবার নরসিংদী জেলায় অবস্থিত সম্ভবত একটি মফস্বলের স্কুলের সঙ্গে কলেজ থেকে ঢাকা বোর্ডে পাবলিক পরীক্ষায় শীর্ষস্থান পেয়েছে। মিডিয়ার সাক্ষৎকারে প্রধান শিক্ষক বলেছেন তাদের শিক্ষাদান পদ্ধতি অনুশীলনমূলক (Exercise Oriented) এবং শেখার বিষয়টি শ্রেণীকক্ষেই নিষ্পন্ন করা হয় যার জন্য টাকার বিনিময়ে বাড়তি কোচিংয়ের প্রয়োজন হয় না। প্রতিটি শিক্ষকই সুশৃঙ্খল পাঠদানে এবং প্রধান শিক্ষকের নজরদারি ভীষণ জোরদার বিধায় ফলাফল সর্বাগ্রে। এ ধরনের অনুশীলন প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্থাপন করতে হবে।

চতুর্থত, শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধির জন্য উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধি ও জবাবদিহিতার বিকল্প নেই সত্যি কিন্তু তার জন্য স্নাতকোত্তর পর্যায়ের পরও গবেষণা ডিগ্রি অর্জনের জন্য এমফিল/পিএইচডি/ ডিলিট/ ডিবিএ পড়ার সুযোগ রয়েছে বেতন-ভাতাদিসহ শিক্ষা ছুটির মাধ্যমে। এই সুযোগটি গ্রহণ করে অনেকেই নিজের দক্ষতা বৃদ্ধিতে সক্ষম হলেও অনেকেই দেশে ফিরছেন না কিংবা দেশে ফিরলেও উৎপাদনশীল শিক্ষার কাজে নিজেকে ব্যবহার থেকে বিরত থাকছেন। অনেকেই বলছে উচ্চ শিক্ষা প্রতিষঠানগুলোতে পিএইচডি ডিগ্রিধারীদের পদচারণায় মুখর কিন্তু তাদের তেমন কোন অবদান না আছে শিক্ষায় না আছে গবেষণায় অর্থাৎ তাদের বলা হয় সুবিধাবাদী শ্রেণী (Opportunist Class)। কিন্তু গুণীজন বলছেন যে যত বেশি জ্ঞানী হন তিনি তত বেশি উদার হন নৈতিকতার দিক থেকে অথচ বাস্তবে ঘটছে তার উল্টো। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের এমফিল/পিএইচডি/ ডিলিট/ ডিবিএ পর্যায়ে ছাত্র গাইড করার কথা থাকলেও তা তেমন দেখা যায় না। ফলে গবেষণা উপেক্ষিত যা হতে পারত শিক্ষার মানোন্নয়নের বড় হাতিয়ার। এ ব্যাপারে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি।

পঞ্চমত, বাংলাদেশের বর্তমান সরকার প্রণীত সুনির্দিষ্ট নীতিমালা থাকা সত্ত্বেও শিক্ষা ও গবেষণাকর্মে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অনীহা কোনো ভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক গবেষণার প্রাসঙ্গিকতা অনস্বীকার্য। কেননা আগামীতে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতে যাচ্ছে। সেক্ষেত্রে অর্থনৈতিক বা বাণিজ্য বিষয়ক গবেষণার কোনো বিকল্প নেই। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অর্থনীতি বিভাগগুলো গবেষণা সেল চালু করে প্রত্যেকটি বিভাগের শিক্ষকদের অথনীতি বিষয়ক সংলাপে আত্মনিয়োগ করাতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিষয়ভিত্তিক আন্তর্জাতিক সেমিনার বছরে দুইবার আয়োজন করার উদ্যোগ গৃহীত হতে পারে। বর্তমানে বিশ্বব্যবস্থায় চলছে উচ্চশিক্ষার উদারিকরণ ও বাজারিকরণ। এক্ষেত্রে শিক্ষা হতে হবে সর্বজনীন ও জব ওরিয়েন্টেড। বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও আমরা এই প্রক্রিয়ার বাইরে অবস্থান করতে পারি না। শুধু পলিসি প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন নয়, প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ের কর্মপরিসরে পরিবর্তন আনয়ন এখন আশু প্রয়োজন। শিক্ষার বিভিন্ন স্থরে গুণগতমান বৃদ্ধি, ছাত্রদের ধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধি, শিক্ষায় ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন, গবেষণায় অংশগ্রহণ বৃদ্ধি, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন পুনর্গঠন ইত্যাদি এখন সময়ের দাবি। সর্বশেষে বলা যায়, শিক্ষাই হউক সমাজ ও মানবিক উন্নয়নের হাতিয়ার-এটাই হউক প্রত্যাশা।

লেখক: প্রফেসর ও ডিন, ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদ, সিটি ইউনির্ভাসিটি, ঢাকা-১২১৫

(এমআর/এসএএম/০৩ মে ২০২১)

 

 

Short URL: http://biniyougbarta.com/?p=143803

সর্বশেষ খবর