করোনায় বৈশ্বিক ঝুঁকিতে বিনিয়োগ

মুহাম্মদ জাভেদ হাকিম: করোনা ভাইরাসে লন্ডভন্ড প্রায় পুরো বিশ্ব। দিনদিন এর ধ্বংসযজ্ঞ বেড়েই চলছে। বিভিন্ন রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক মেরুদন্ড ভেঙ্গে দেয়ার পাশাপাশি কেড়ে নিচ্ছে মানুষের প্রাণ। প্রতিদিনই আক্রান্তর সংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে লাশের সাড়িও বাড়ছে। মৃত্যুর মিছিল বেড়েই চলছে। তামাম দুনিয়ার অধিকাংশ দেশই লকডাউন। তবুও কোন অবস্থাতেই করোনার লাগাম টানা যাচ্ছে না। এর আক্রমণ হতে গরিব, ধনী, রাজা, রানী – মহারাজা কেউই বাদ যাচ্ছেন না। ইতিমধ্যে আক্রান্ত হয়েছেন বৃটিশ রানী, প্রধানমন্ত্রীসহ স্বাস্থ্য মন্ত্রীও। মারা গেছেন স্পেনের রাজকন্যা। বাংলাদেশও ইতিমধ্যে করোনা ভাইরাসে আক্রান্তর শিকার।

সর্বশেষ পাওয়া খবরে জানা যায়, পুরো বিশ্বে এই পর্যন্ত প্রায় ৬লাখ ২২ হাজর মানুষ আক্রান্ত। আর মৃতের সংখ্য প্রায় ৩১ হাজার। পরিস্থিতি সামলাতে দফায় দফায় বৈঠক বসছেন বিশ্ব নেতারা। কিভাবে ঠেকানো যায় প্রাণঘাতী করোনা। কী ধরণের পরিকল্পণা বাস্তবায়ন হলে করা যাবে করোনা ভাইরাসের বিস্তার রোধ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কর্মকর্তাদেরও নানান করণীয় নিয়ে গলদর্ঘম অবস্থা। কিন্তু ফলাফল শুন্য।

এই শুন্যতা হতেই সৃষ্টি হবার সম্ভাবনা রয়েছে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়। বাংলাদেশের মত অনেক উন্নয়নশীল দেশেও লকডাউনের পাশাপাশি চলছে সাধারণ ছুটি। রেডিমেট ওয়্যার রপ্তানীকারক দেশ হিসেবে পৃথিবীর দ্বিতীয় তালিকায় থাকা বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পও হুমকির মুখে। এর বৃহত্তর বাজার ইউরোপ। কিন্তু সেই ইউরোপের অবস্থাও করোনায় করেছে করুণ। ফলে একে একে অর্ডার বাতিলসহ পূর্বে তৈরী করা পণ্য ডেলিভারী না নেওয়ায় জটলা বাঁধছে। শ্রমিকদের কর্মঘন্টা কমিয়ে দিয়েও শেষ রক্ষা হচ্ছে না। এরইমধ্যে অর্ডার বাতিল হয়েছে, প্রায় ৩০০ কোটি মার্কিন ডলার। চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে প্রায় ২০ লাখ পোশাক শ্রমিক। যার ফলে গত ২৭ মার্চ  বিজিএমএ আওতাধীন পোশাক কারখানা গুলো বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে আগামী কিছুদিনের মধ্যেই বন্ধ হয়ে যেতে পারে দেশের পোশাক কারখানাগুলো। এক অদৃশ্য শক্তি করোনা ভাইরাসে সব অবরুদ্ধ। মানুষের স্বাভাবিক কাজকর্ম সব বন্ধ।  আতংকিত জনপদ। দরিদ্র শ্রেণির জন্য চরম বিপর্যয়। বড় বড় কোম্পানি গুলোর পরিচালকরা হতাশাগ্রস্থ। তারা বুঝতে পারছেন না এর ভবিষ্যৎ কি।

বাংলাদেশ সরকার ইতিমধ্যে রপ্তানী খাতে ৫ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা করেছে। কিন্তু সাধারণ ব্যবসায়ী, দোকানী ও দিনমজুরদের অবস্থা শোচনীয়। নাজুক অবস্থায় তাদের দিনানিপাত। যুক্তরাষ্ট্রর ইতিহাসে সবচাইতে বড় আর্থিক সহায়তা তহবিল, ২ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার ঘোষণা করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইতিমধ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ৭৪টি দেশে চিকিৎসা সরঞ্জাম পাঠানো শুরু করেছে। সেই সঙ্গে আরো ৬০টি দেশে পাঠানো প্রক্রিয়াধীন। কোবিড ১৯ করোনা মহামারীর ভয়াবহতা পুরো বিশ্বকে এককাতারে নিয়ে এসেছে। বিভিন্ন দেশের হোম কোয়ারেন্টেইনের দুর্বিষহ দিন গুলো, কবে পর্যন্ত সমাপ্তি হবে তা কেউই জানে না। যেসব দেশ ৭/১০ দিনের জন্য লকডাউনের ঘোষণা দিয়েছিলো,তারা আরো সময় বাড়িয়েছে।

‘যদি থাকেন সচেতন-ঠেকানো যাবে করোনা’- এ ধরনের স্লোগান ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে চেষ্ঠা করা হচ্ছে। কিন্তু এরকম স্লোগানেও অনেক রাষ্ট্রে জনগণকে ঘরবন্দী করে রাখা যাচ্ছে না। ফলে বাধ্য হয়েই কিছু কিছু রাষ্টে,কার্ফিউ জারি করে প্রশাসন কঠোর হতে বাধ্য হচ্ছে। বাংলাদেশেও পুলিশ বাহিনীর সঙ্গে সঙ্গে সেনাবাহিনী মাঠে নেমেছে। তারা যথাসম্ভব চেষ্টা করছে জনগণকে সচেতন করে ঘরে ফিরাতে। কিন্তু কত দিন? কারণ, বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ নিম্ন আয়ের। তাদের ভরণপোষণের যথাযথ ব্যবস্থা করতে না পারলে, হয়তো আর তাদেরকে হোম কোয়ারেন্টেইনে রাখা সম্ভব হবে না। তখন করোনার ভয়াল ছোবল, কেড়ে নিতে পারে অনেকটাই অসচেতন বাংলাদেশীদের লাখো প্রাণ। এতে শুরু হতে পারে সামাজিক অস্থিরতা। প্রশাসন ও জনগণ মুখোমুখী অবস্থানে চলে যেতে পারে। এর জন্য চাই এখনি দূরদর্শী মহাপরিকল্পণা।

করোনা চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় সংক্রামণ ব্যাধি। সুতরাং এর থেকে পরিত্রাণ পেতে চাইলে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা জরুরী। যা বাংলাদেশের জন্য বিশাল চ্যালেঞ্জ। সরকার প্রধানদের এখন থেকেই না ভাবলে,চরম মাশুল দিতে হবে জনগণ তথা পুরো রাষ্ট্রকে। করোনা বাংলাদেশের সম্ভাব্য অর্থনৈতিক উন্নয়ন খাত পর্যটনশিল্পকেও হুমকির মুখে ফেলেছে। এই খাতে বিনিয়োগসহ হাজার হাজার বেকারের, কর্মস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এসব নিয়েও ভাবতে হবে সংশ্লিষ্টদের। যেন অঙ্কুরেই পর্যটনশিল্প ধ্বংস না হয়। এত এত প্রাণহানী আর অথনৈতিক ক্ষতি সাধনের পরেও সম্প্রতি একটি বিষয় চাউর হয়েছে। অনেক প্রকৃতি প্রেমিক বোদ্ধাদের উচ্ছ্বাস,পৃথিবী ফিরে পেতে যাচ্ছে তার আগের রুপ। বায়ুদুষণের মাত্রা কমে এসেছে। হিমবাহে বরফ গলার মাত্রা কমতে শুরু করেছে। সামুদ্রিক প্রাণী  সমুদ্র জলে, অবাধে বিচরণ করতে পারছে। ঘর থেকেই ঝঁকঝঁকে নীল আকাশ আর রাতে উজ্জ্বল তারার মেলা দেখা যাচ্ছে। সমাজ নিয়ে ভাবা মানুষদের দাবি, ফিরে আসতে শুরু করেছে পারিবারিক বন্ধন। নিয়মিত খোঁজখবর রাখা হচ্ছে আত্মীয় স্বজনদের। কমে এসেছে অপরাধমূলক কর্মকান্ড। আবারো লিখতে হয়-কিন্তু কতদিন! মানুষের চিরাচরিত স্বভাবজাত অভ্যাস মুক্ত বিচরণ। ঘরবন্দী মানে এক গুমোট পরিস্থিতি। আর এর থেকে মানুষ বের হয়ে আসার জন্য থাকবে ব্যাকুল। অন্তত বাংলাদেশে তা সম্ভব নয়। যা আপনি সামাজিক,অর্থনৈতিক কিংবা সচেতনতার অভাব-যাই বলুন না কেন।

চীনে করোনা ভাইরাস ছড়ানোর পরপর আমাদের দূরদর্শী পরিকল্পণা নেয়া দরকার ছিলো। কিন্তু তা না করে যে ভুল হয়েছে, তা যেন আর না হয়। সেদিকে এখন থেকেই দায়িত্বশীলদের কড়া নজরদারী রাখা প্রয়োজন। নতুবা ধ্বংস হবে দেশের অর্থনীতি, হতে পারে চরম মানবিক বিপর্যয়। সুতরাং অতিদ্রুত সরকারকে করোনা ভাইরাস বিস্তার রোধ ও পরবর্তী অর্থনৈতিক মন্দা পরিস্থিতি, সামলানোর মত যুগান্তকারী পদক্ষেপ নেয়া আজ বড় প্রয়োজন। দেশের ইতিহাসে যেন কোন কালো অধ্যায় যোগ না হতে পারে, সেজন্য প্রয়োজনে সরকারের পক্ষ হতে – জাতীয় ঐক্যের আহবানও জানানো যেতে পারে। মানুষের জন্যই এই ভূমন্ডল আর রাজনীতি। তাই মানুষ তার নিজ প্রয়োজনেই, প্রকৃতির উপর সদয় হবার পাশাপাশি যেন একে অপরের প্রতি মানবিকতা ফিরে পায়। কারণ, প্রকৃতি যেমনি কোমল, ঠিক তেমনি আবার কঠোর। পরিশেষে লিখতে হয় – বিশ্ববাসীর জন্য করোনা আশীর্বাদ নাকি অভিশাপ হয়ে এসেছে, তা সময়ই বলে দিবে। তবে যাই হোক না কেন, টিকে থাক পৃথিবী-সুস্থ্য থাকুক মানব জাতি; এটাই আমাদের কামনা। মহামারী করোনা, প্রাণ-প্রকৃতির চরম শিক্ষা।

লেখক: প্রতিষ্ঠাতা চীফ অর্গানাইজার, ‘দে-ছুট’ ভ্রমণ সংঘ।

 


Comment As:

Comment (0)