অর্থনীতি সচল রাখতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে

আলি জামান: করোনা-পরবর্তী দেশের ভবিষ্যতের অর্থনীতি নিয়ে সংশ্লিষ্টরা ইতিমধ্যে ভাবনা-চিন্তা শুরু করেছেন। ধারণা করা যায়, করোনা ইস্যুতে সারা দুনিয়ার মতো আমাদের অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

এর থেকে উত্তরণের জন্য স্রেফ দুইটা বিকল্প সামনে খোলা আছে।

এক. করহার বাড়ানো আর নতুন কর ধার্য। আর দুই. কৃচ্ছ্রসাধন। কিন্তু বাস্তবতার কারণে কর বাড়ানো কতটুকু সংগত হবে?

ধনীদের ওপর, নতুনভাবে সম্পদ কর আরোপ করা যেতে পারে। কিন্তু তাতে করে ব্যবসা-বাণিজ্য নিরুত্সাহিত হবে। অর্থনীতিতে মন্দা নেমে আসবে। বরং উত্পাদন, কর্মসংস্থান যাতে ব্যাহত না হয়— সেই উদ্দেশ্যে, তাদের জন্য বেইল আউট স্কিম নিতে হতে পারে। ভ্যাটের হার আর বাড়ানো সম্ভব নয়। করোনার কারণে দেশে দেশে আর্থিকভাবে মন্দা দেখা দিয়েছে। আমাদের দেশেও এর প্রভাব পড়বে। এই অবস্থায় ব্যবসা-বাণিজ্য তথা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনাই দুষ্কর হবে। আর প্রান্তিক ও নিম্নআয়ের মানুষের তো ক্রয়ক্ষমতাই থাকবে না বলা যায়। সেক্ষেত্রে উত্পাদন আর আমদানি পর্যায়ে ১৫ শতাংশ হারে প্রদত্ত স্বাভাবিক ভ্যাট দেওয়ার পর পণ্য বিক্রির প্রতি স্তরে নতুন করে ভ্যাট দেওয়া তাদের পক্ষে কতটুকু সম্ভব হবে?

করোনা-পরবর্তী মন্দার কারণে ধনী ব্যক্তি ছাড়া অন্য সব সাধারণ মানুষ স্বাভাবিকভাবেই হাতে থাকা অর্থ আগলিয়ে রাখতে চাইবে। অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে গেলে, মানুষকে ব্যয় নির্বাহে উত্সাহিত করতে হবে। কিন্তু প্রতিবার হাতবদলে ভ্যাট প্রদানের কারণে পণ্যমূল্য বেড়ে গেলে, জনসাধারণ পণ্য খরিদে নিরুত্সাহিত হবে। এখানে উল্লেখ্য যে, পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে আরোপিত ভ্যাট বাবদ আদায় অতি নগণ্য, যা রাজস্ব বোর্ডের মোট আদায়ের ১ শতাংশেরও নিচে। এর প্রভাব আদৌ দৃশ্যমান হবে না। বরং সাধারণ মানুষ সন্তুষ্ট হবে, যা অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। উল্লেখ্য, চীন এবং জাপান করোনা সংক্রমণের পর ঐ দেশের সরকার ব্যবসা-বাণিজ্য সচল রাখতে উদ্যোক্তাদের দিকে প্রথমেই সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়।

প্রশ্ন হলো, তাহলে সরকার চলবে কীভাবে? এর উত্তর হলো—স্রেফ কৃচ্ছতাসাধন করে। যাবতীয় অপ্রয়োজনীয় এবং এখনই প্রয়োজন নয় এমন উন্নয়ন ব্যয় কমাতে হবে। অপ্রয়োজনীয় সরকারি কেনাকাটা কমাতে হবে। অতি জরুরি পরিস্থিতি ছাড়া বিদেশ ভ্রমণ বন্ধ করতে হবে।

কৃচ্ছতা সাধনের অন্যতম প্রধান উপায়— দুর্নীতি রোধ। দুর্নীতি রোধ করতে পারলে, সরকারি ব্যয় প্রায় ৩০ শতাংশ কমে যাবে।

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য সচল রাখার জন্যে একটি আর্থিক প্রণোদনা কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন যার মধ্যে রয়েছে— ১) বৃহত্ শিল্প ও সেবা খাতের জন্যে ৩০ হাজার কোটি টাকা। ২) কুটিরশিল্পসহ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতের জন্যে ২০ হাজার কোটি টাকা। ৩) রপ্তানি উন্নয়ন ফান্ডে ১২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা। ৪) প্রি-শিপমেন্ট ক্রেডিট স্কিমে ৫ হাজার কোটি টাকা এবং ৫) কর্মচারীদের বেতনভাতা পরিশোধে ৫ হাজার কোটি টাকা প্রদান করা হবে। তবে এর সম্পূর্ণ অর্থই ঋণ হিসেবে প্রদান করা হবে। ব্যাংকগুলো গ্রাহকদেরকে ৯ শতাংশ সুদে এই ঋণ দেবে যার মধ্যে অর্ধেক সুদ সরকার ভর্তুকি হিসেবে প্রদান করবে। করোনাজনিত এই রকম অবস্থা সহজে কাটবে না। সে কারণে দরিদ্র প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে বাঁচিয়ে রাখতে এই মানুষগুলোকে নগদ টাকা ও খাদ্য সহায়তা দেওয়া লাগবে। তার জন্য বিপুল অর্থ ব্যয়ের প্রয়োজন হবে। এ পর্যন্ত খাতওয়ারি যত প্রণোদনা এসেছে তার বৈশিষ্ট্য কী? ঋণই বেশি। পরিস্থিতি যা দাঁড়াবে, সত্যিকার ব্যবসায়ীরা এই সুদে ঋণ দিলেও এই ঋণ নেবে কি না সন্দেহ। এখন সরকারি ব্যয় বাড়িয়ে জনগণের ক্রয়ক্ষমতা বাড়াতে হবে। নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও গরিবদের ক্রয়ক্ষমতা না থাকলে ব্যবসায়ীরা ঋণ নিয়ে কী করবে? সেজন্য দরকার রাজনৈতিক অঙ্গীকার। প্রচুর পরিমাণে কাজ সৃষ্টি করতে হবে। তার মধ্যে অন্যতম হলো কাজের বিনিময়ে খাদ্য, ছোটো ছোটো শিল্প-কারখানায় সুদবিহীন ঋণ দিয়ে প্রচুর লোকের কর্মসংস্থান করা। শিল্পোন্নত দেশ যেভাবে প্রণোদনা দিয়েছে তা এখানে মানায় না। কারণ তাদের অর্থনীতি রপ্তানিমুখী। তাদের বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা করার ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য এ প্রণোদনা। আমাদের অবস্থা সম্পূর্ণ বিপরীত। আমাদের কর্মসূচি হওয়া উচিত স্থানীয় উত্পাদন শিল্পগুলোকে টিকিয়ে রাখা আর এর জন্যে দরকার মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানো। ইতিমধ্যে দেশে দেশে ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দা দেখা দেওয়ায় কর্মী ছাঁটাই করা হচ্ছে। আমাদের লক্ষ্য রাখতে হবে যাতে সর্বনিম্ন সংখ্যক কর্মী ছাঁটাই করা সম্ভব হয়।

এখানে একটা আশার কথা আছে। করোনা-পরবর্তীকালে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমে আসায়, সরকারের ব্যয় অনেকটা সাশ্রয় হবে। সেক্ষেত্রে, রাজস্ব আয় যদি টার্গেট থেকে ২৫ শতাংশও কম হয়, তাহলেও ভয়ের কিছু নেই। রাজস্ব খরচ আর উন্নয়ন ব্যয় মিটিয়েও প্রান্তিক মানুষদের ছয় মাসের খাবার জোগান দিতে সমস্যা হবে না, যদি অপচয় আর দুর্নীতি সত্যিকারভাবে রোধ করা যায়।

লেখক: সভাপতি, এসএমই ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ।

(বিনিয়োগবার্তা/১১ এপ্রিল ২০২০)


Comment As:

Comment (0)