পুঁজিবাজারে লেনদেন চালু নিয়ে ডিএসই পরিচালকদের মধ্যে দ্বিমত
বিনিয়োগবার্তা ডেস্ক, ঢাকা: করোনাভাইরাসের মহামারি মোকাবেলায় দেশে সাধারণ ছুটি চলছে। সংক্রমণ এড়াতে দেশের অনান্য সেক্টরের মতো পুঁজিবাজারও ছুটির কবলে পড়েছে। এই ছুটির সঙ্গে মিলিয়ে বন্ধ রাখা হয়েছে দেশের পুঁজিবাজারের লেনদেনসহ সকল কার্যক্রম। দেশে করোনা পরিস্থিতির অবনতি হতে থাকায় ছুটির মেয়াদ আরেক দফা বাড়তে পারে। আর এই সম্ভাবনাকে সামনে রেখে পুঁজিবাজারে শুরু হয়েছে নানা আলোচনা। ছুটির মেয়াদ বাড়ালে পুঁজিবাজারেও কী লেনদেন বন্ধের মেয়াদ বাড়ানো হবে, নাকি ছুটি মধ্যেই লেনদেন শুরু হবে-তা নিয়ে বেম আগ্রহ রয়েছে ব্রোকার, বিনিয়োগকারীসহ স্টেকহোল্ডারদের। আর এ জল্পনা-কল্পনা নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে মতামত দিয়েছেন দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) পরিচালকরা।
এক বিবৃতিতে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) পরিচালক ও সাবেক প্রেসিডেন্ট মোঃ রকিবুর রহমান সাধারণ ছুটির মেয়াদ বাড়লেও আগামী ২৬ এপ্রিল থেকে পুঁজিবাজারে লেনদেন শুরুর আহ্বান জানিয়েছেন। অন্যদিকে পরিচালক শাকিল রিজভী ও মিনহাজ মান্নান ইমন ছুটি বাড়লে লেনদেন বন্ধের মেয়াদও বাড়ানোর পক্ষে মত দিয়েছেন।
বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমে প্রেরিত এক বিবৃতিতে বেশ কিছু যুক্তিও তুলে ধরেছেন তারা।
নিচে লেনদেন চালুর পক্ষে-বিপক্ষে তাদের যুক্তিগুলো তুলে ধরা হলো-
মোঃ শাকিল রিজভী
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের পরিচালক ও সাবেক প্রেসিডেন্ট শাকিল রিজভী বলেন, করোনা মোকাবেলার জন্য সরকার সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে। আমরা সরকারের এই চেষ্টার বাইরে থাকতে পারি না।
তিনি বলেন, সাধারণ ছুটিতে লেনদেন বন্ধ রাখার পেছনে আরও কিছু যৌক্তিক কারণ রয়েছে। আমাদের বাজার পুরোপুরি ডিজিটাল নয়। তাই লেনদেন প্রক্রিয়ায় অনেকের শারীরিক উপস্থিতির প্রয়োজন পড়ে। করোনার এই দুর্যোগকালে যত মানুষ বাইরে আসবে, ততই ঝুঁকি বাড়বে সংক্রমণের।
কেউ কেউ যে বলছেন স্টক এক্সচেঞ্জে মাত্র ৩/৪জন কর্মকর্তা উপস্থিত থাকলেই লেনদেন চালু করা সম্ভব, শাকিল রিজভী তার সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, শুধু ডিএসইর ট্রেডিং সিস্টেম চালু ও পরিচালনার জন্য ২৫ থেকে ৩০ জন প্রকৌশলী প্রয়োজন হয়। এছাড়া সার্ভিল্যান্স, স্যাটলমেন্টসহ বিভিন্ন বিভাগে অনেক জনবল যুক্ত।
ডিএসইর সাবেক এই সভাপতি বলেন, আরও সমস্যা আছে। সাধারণ ছুটিতে ব্রোকারহাউজগুলোর অনেক কর্মকর্তা ঢাকার বাইরে তাদের গ্রামের বাড়িতে চলে গেছেন। কারণ, সারা বছর অনেক চাপে থাকতে হয়, ছুটি অনেক কম বলে তাদের পক্ষে বাড়ি যাওয়ার সুযোগ হয় কম। এখন হঠাৎ লেনদেন শুরু হলে এই লকডাউনের মধ্যে তারা কর্মস্থলে ফিরবে কিভাবে? ঢাকাতে যারা আছেন, তাদের্ কেউ কেউ লকডাউন এলাকায় বাস করেন। ডিএসইর অনেক ব্রোকারহাউজের প্রায় সব শাখাই ভাড়াকৃত অফিসে। ওই ভবনগুলোর মালিকরা অফিস খোলার অনুমতি না-ও দিতে পারেন।
মিনহাজ মান্নান ইমন:
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন বলেন, তার দীর্ঘ ক্যারিয়ারের প্রায় পুরোটাই পুঁজিবাজারের সঙ্গে যুক্ত। পুঁজিবাজারই তার রুটি-রুজি। তাই দীর্ঘ সময় এই বাজার বন্ধের বিষয়টি তার জন্য বেশ কষ্টকর। কিন্তু কখনো কখনো বাস্তবতা মেনে নেওয়া ছাড়া কোনো উপায় থাকে না। তাই যদি ২৫ এপ্রিলের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি না হয়, সরকার সাধারণ ছুটির মেয়াদ আরও বাড়ায়, তাহলে পুঁজিবাজারে লেনদেন বন্ধ রাখার মেয়াদও বাড়ানো ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না।
তিনি বলেন, করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলা এবং মানুষের নিরাপত্তার স্বার্থে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে সরকার। এমন দুর্যোগময় সময়ে সরকারের নেওয়া ব্যবস্থার বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কারণ বিদ্যমান পরিস্থিতি আর সরকার ঘোষিত ছুটির মধ্যে লেনদেন চালু করা হলে কোনো বিনিয়োগকারী; স্টক এক্সচেঞ্জ বা ব্রোকারহাউজের কেউ করোনায় আক্রান্ত হলে দায়িত্ব কে নেবে?
লেনদেনের বিষয়টি নিয়ে মিনহাজ মান্নান ইমন বলেন, পুঁজিবাজারে লেনদেনের সঙ্গে অনেকগুলো পক্ষ জড়িত। এদের মধ্যে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি), সিডিবিএল সাধারণ ছুটিতে বন্ধ আছে। ব্যাংক খোলা থাকলেও ব্যাংকিং হচ্ছে সীমিত পরিসরে, অল্প সময়ের জন্য। অ্ন্যদিকে সংক্রমণের ঝুঁকি এড়াতে মানুষের চলাচল নিয়ন্ত্রিত করা হয়েছে। নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে ফেলা হয়েছে। আমাদের ট্রেডিং ব্যবস্থা এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থা পুরোপুরি অটোমেটেড নয়। এমন অবস্থায় করোনার ছুটিতে লেনদেন চালুর কোনো সুযোগই নেই।
তিনি বলেন, পুঁজিবাজার বন্ধ থাকায় অনেক ক্ষতি হয়েছে। আরও হবে। একদিকে বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, অন্যদিকে আমাদের আয় সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। পরিস্থিতি এমন হয়েছে যে কোনো কোনো ব্রোকারহাউজের পক্ষে হয়তো বেতন দেওয়া-ই কঠিন হয়ে পড়বে। তবু আমরা এই ক্ষতিকে মেনে নিচ্ছি প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনাকে মেনে নিয়ে। কারণ ব্যবসার লাভ-ক্ষতি বা অর্থনীতির চেয়েও জীবনের নিরাপত্তা বেশি জরুরি।
মো: রকিবুর রহমান:
এদিকে এক বিবৃতিতে ব্যাংকের লেনদেনের সঙ্গে মিল রেখে দেশের পুঁজিবাজারে লেনদেন চালু করার আহ্বান জানিয়েছেন ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) পরিচালক ও সাবেক প্রেসিডেন্ট মোঃ রকিবুর রহমান।
তিনি বলেন, করোনাভাইরাসে বিশ্বের অনেক দেশে লকডাউন থাকলে্ও কোনো দেশেই পুঁজিবাজারে লেনদেন বন্ধ করা হয়নি। বিশ্বায়ন ব্যবস্থায় বাংলাদেশ অন্য দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে পারে না। তাছাড়া বর্তমান বিপর্যয়কর পরিস্থিতিতে অনেক বিনিয়োগকারীর জরুরি টাকা দরকার। লেনদেন বন্ধ থাকায় তারা তাদের বিনিয়োগ থেকে কোনো টাকা তুলে নিতে পারছেন না।
বিবৃতিতে তিনি বলেন, যদি সাধারণ ছুটির মেয়াদ বাড়েও তবু আগামী ২৬ এপ্রিল পুঁজিবাজারে লেনদেন শুরু করা উচিত। কারণ, বিশ্বায়নের যুগে বিশ্বের অন্য পুঁজিবাজারগুলো থেকে আমাদের বাজার আলাদা থাকতে পারে না। বিদেশী বিনিয়োগকারীদের জন্য এটি একটি ভুল বার্তা দিচ্ছে।
রকিবুর রহমান বলেন, মানবিক কারণেও পুঁজিবাজারে লেনদেন চালু করা জরুরি। অনেক ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী আছেন, যাদের জীবনের সব সঞ্চয় পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করা আছে। বর্তমানে সাধারণ ছুটিতে সবকিছু বন্ধ থাকায় তাদের অনেকেরই আয়-রোজগার নেই। তাদের হয়তো জরুরি টাকা দরকার। কারণ, অর্থনীতির আগে বেঁচে থাকা জরুরি। কিন্তু লেনদেন বন্ধ থাকায় তারা তাদের বিনিয়োগ থেকে কোনো টাকা তুলে নিতে পারছেন না। লেনদেন চালু হলে তারা তাদের এই সঙ্কট একটু সহজে মোকাবেলা করতে পারবেন।
তিনি বলেন, যেহেতু বিএসইসি শেয়ারের ফ্লোর প্রাইস (শেয়ারের দামের সর্বনিম্ন সীমা) বেঁধে দিয়েছে, তাই বাজারে দর পতনেরও কোনো ভয় নেই। বরং বাংলাদেশ ব্যাংক দেশের তফসিলি ব্যাংকগুলোকে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের জন্য ২শ কোটি টাকা করে যে তহবিল সুবিধা দিয়েছে, তা এই সময়ে বিনিয়োগে এসে বাজারকে সাপোর্ট দিতে পারে।
ডিএসইর এই পরিচালক জানান, লেনদেন চালুর জন্য খুব বেশি জনবল প্রয়োজন হবে না। প্রত্যেক ব্রোকারহাউজে সংশ্লিষ্ট বিভাগের সর্বোচ্চ ৪ থেকে ৫ জন লোক, সিডিবিএলের কয়েকজন কর্মকর্তা, স্টক এক্সচেঞ্জের আইটি ও সার্ভিল্যান্স বিভাগসহ দুতিনটি বিভাগের কর্মকর্তা, বিএসইসিতে সার্ভিল্যান্স বিভাগের দু’তিন জন কর্মকর্তা হলেই চলবে। আর ব্যাংকতো এমনিতেই খোলা আছে। ব্যাংকিং এর সময়ের সঙ্গে মিল রেখেই লেনদেনের সময়সূচি নির্ধারণ করা যায়।
তিনি বলেন, বিনিয়োগকারীদেরকে ব্রোকারহাউজে এসে লেনদেন করতে হবে না বলে তেমন ঝুঁকি নেই। তারা ডিএসইর অ্যাপ ব্যবহার করে, ইমেইলে অথবা টেলিফোনে শেয়ার কেনাবেচার আদেশ দিতে পারবেন।
(শামীম/২১ এপ্রিল ২০২০)