পুজিবাজারে নতুন দিন-নতুন প্রত্যাশা
এ্যাডভোকেট খায়রুল আমান: চলমান করোনা সংকটে সরকার সঠিক সময় সঠিক সিন্ধান্ত নিয়েছিল। প্রথমধাপে ২৬ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত সাধারন ছুটি ঘোষনা করা হয়েছিল। এরপর দ্বিতীয় দফায় ৭ দিন সাধারন ছুটি বাড়িয়ে ৫ এপ্রিল থেকে ১১ এপ্রিল পর্যন্ত করা হয়। এরপর থেকে ধাপে ধাপে ছুটি বাড়িয়ে সর্বশেষ ৩০ মে পর্যন্ত করা হয়েছে। এরই প্রেক্ষিতে অনান্য সেক্টরের সাথে পুঁজিবাজারের লেনদেনও বন্ধ ঘোষনা করে কর্তৃপক্ষ। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় সিন্ধান্তটি বাজারের জন্য সময়োপযোগী ছিল। গত ১৯ মার্চ মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে পতন ঠেকাতে কোম্পানিগুলোর শেয়ার ও ইউনিট দরের সার্কিট ব্রেকার ফ্লোর প্রাইস (সর্বনিম্ন সীমা নির্ধারণ) করে নির্দেশনা জারি করে নিয়ন্ত্রণ সংস্থা বিএসইসি। এতে গত ২২ থেকে ২৪ মার্চ মাত্র ৪ কার্যদিবস শেয়ারবাজার একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিল মাত্র। কোন টার্নওভার ছিল না, ক্রেতা-বিক্রেতা শূন্য। এটা ছিল বাজারকে কোনোরকম অক্সিজেন দিয়ে বাঁচিয়ে রাখা। এই ফ্লোর প্রাইস নির্ধারণের ফলে তলানিতে পড়ে থাকা বাজার কোনো রকম বেঁচে আছে। বাজার বন্ধের পূর্বে ফ্লোর প্রাইস ও সার্কিট ব্রেকার দিয়ে আমাদের পুঁজিবাজারকে বাঁচিয়ে রাখা ছিল আমাদের জন্য নতুন একটি অভিজ্ঞতা।
সোস্যাল ডিস্টেন্স, হোম-কোয়ারেন্টিন, লকডাউন এর মধ্যে আমাদের পুঁজিবাজারেও কিছুটা পরিবর্তন চোখে পড়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসিতে এই পরিবর্তনটি বর্তমান বাজারের জন্যও সময়োপযোগী। বিনিয়োগকারীসহ বাজার সংশ্লিষ্টদের অনেক দিনের প্রত্যাশা পুরণ হল। দীর্ঘদিন পর সিকিউরিটি অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) চেয়ারম্যান পদের পরিবর্তন হলো। বিএসইসির নতুন চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নিলেন অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম। নতুন চেয়ারম্যান জনাব রুবাইয়াত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্সুরেন্স বিভাগের অধ্যাপক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজনেস স্টাডিজ অনুষদের ডিন হিসাবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। অর্থ মন্ত্রনালয়ের একটি প্রঞ্জাপন জারির মাধ্যমে, সিকিউরিটি অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন আইন ১৯৯৩ এর ধারা ৫ ও ৬ এর বিধানগুলো পরিপালনের মাধ্যমে এবং একই আইনের ৫(২) ধারা অনুযায়ী আগামী ৪ (চার) বছর মেয়াদের জন্য বিএসইসির চেয়ারম্যান পদে দায়িত্ব পেলেন তিনি। প্রঞ্জাপন জারির পর গত ১৭ মে বিকালেই কমিশনে চেয়ারম্যান হিসাবে কাজে যোগ দিয়েছেন। এর পরপরই দেশের পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) তিনজন কমিশনার নিয়োগের বিষয়টি চূড়ান্ত করা হয়েছে। আগামী চার বছরের জন্য প্রতিষ্ঠানটির কমিশনার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন সাবেক শিল্প সচিব আব্দুল হালিম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক শেখ শামসুদ্দিন আহমেদ এবং একই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. মিজানুর রহমান। ইতোমধ্যে তারাও কাজে যোগ দিয়েছেন। নতুন চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াতসহ নতুন কমিশনের সব সদস্যকে সকল বিনিয়োগকারীর পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা এবং অভিনন্দন।
বর্তমান করোনা সংকটে ইউরোপ, আমেরিকাসহ সকল উন্নত দেশগুলোতে শেয়ারবাজারে লেনদেন চলছে। বিশ্বের সকল পুঁজিবাজারই নিম্নমুখি এবং ভয়াবহ ধস চলছে। আমাদের পুঁজিবাজারও গত দশ বছর নানান সমস্যা ও ক্ষত নিয়ে দিন পাড় করছে। সকলেই জানেন, গত শেষ এক বছর পুঁজিবাজার কেমন ছিল। দূর্বল আইপিও, বাজার ইনডেক্স, সর্বোচ্চ এবং সর্বনিম্ন লেনদেন, অর্থের প্রবাহ, নিয়ন্ত্রণ সংস্থার ভূমিকা এ সকল বিষয়গুলো কোনটিই স্বাভাবিক ছিল না। এছাড়া ২০১০ সালে আমাদের পুঁজিবাজারে ভয়াবহ দরপতন ঘটে। এরপর গত ১৫ মে ২০১১ সালে ড. এম খায়রুল হোসেন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ লাভ করেন। তিনি দায়িত্ব নিয়ে চেয়ারে বসে সকলের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন ৩ (তিন) মাসের মধ্যে পুঁজিবাজার ঠিক করবেন। পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীসহ সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে তিনি আশ্বস্ত করেছিলেন। তিনি যে উদ্দেশ্য নিয়ে চেয়ারে বসেছিলেন তা আর বাস্তবায়ণ করতে পারেননি। বাজারের ও বিনিযোগকারীর জন্য তার দায়িত্বকালিন সময়টি মঙ্গল হয়নি। প্রত্যশা এবং প্রাপ্তির সাথে কোন মিল খুজে পেলোনা দেশের পুঁজিবাজার এবং সাথে বিনিয়োগকারীরা। জনাব ড. খায়রুল হোসেন এর দায়িত্বকালিন অনেক দূর্বল কোম্পানীর আইপিও বাজারে আসে। তাদের মধ্যে ২৪টি কোম্পানী এখন ফেস ভ্যালুর নিচে। ২টি কোম্পানী বিনিয়োগকারীর নিকট থেকে প্রিমিয়াম নিয়ে বাজারে আসে। এই কোম্পানীগুলো বিনিয়োগকারীদের পথে বসিয়েছে। তবে তার সময়ে পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্ট অনেক আইন-কানুন তৈরি ও সংস্কার করা হয়। আগামী দিনে এসবের সুফল পাওয়া যাবে বলে বিনিয়োগকারিসহ বাজার সংশ্লিষ্টরা আশাবাদী।
বর্তমান এ করোনা সংকটের মেয়াদ সম্পর্কে এই মুহূর্তে কারো কোনো স্পষ্ট ধারণা না থাকায় ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা সম্পর্কে কোন পূর্বাভাস পাওয়া যাচ্ছে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উপর সকল সমস্যা সমাধানে পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকে চাপ বেড়েই চলছে। অর্থনীতির এই অচলাবস্থা চলতে থাকলে বিশ্বজুড়ে মন্দার আশংকা দিন দিন বাড়বে। এদিকে আগামী অর্থবছরের জন্য বাজেট তৈরীর সময় এখন। প্রতিবছরই এই সময় পুঁজিবাজার এবং বিনিয়োগকারীর জন্য মহা সংকটের। তাই বিভিন্ন কারণে বাজার নিম্নমুখী থাকে।
এদিকে ৩১ মে সরকারী ছুটি শেষ হয়েছে। বেশ কিছুদিন যাবৎ ডিএসই ও সিএসইসহ আনেকেরই পুঁজিবাজারে লেনদেন চালুর দাবি ছিল। এরই প্রেক্ষিতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা পুজিবাজারে নিয়মিত লেনদেনের চালুর সিদ্ধান্তে সম্মতি দিযেছেন। অপেক্ষার পালা শেষ হলো। বিএসইসির নতুন চেয়ারম্যানের তত্ত্বাবধানে এবং বর্তমান করোনা সংকটে পুজিবাজারে লেনদেন শুরু হয়। কিন্তু লেনদেন চালুর প্রথম দিন বাজার কিছুটা উত্থানে থাকলেও পরের তিনদিন ফের টানা পতনে নিমজ্জিত হতে থাকে। কবে এ অবস্থা থেকে বের হওয়া যাবে তাও বলা মুসকিল। তবে পুঁজিবাজারকে বিনিয়োগবান্ধব, গতিশীল এবং আস্থা ফিরিয়ে আনা হলো নতুন কমিশনের জন্য বড় একটি চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় নতুন কমিশন সক্ষম হবে- এটিই হলো সকলের প্রত্যাশা।
লেখক: পরিচালক, ল’ এন্ড লিগ্যাল সাপোর্ট সেন্টার।
(আমান/শামীম/০৩ জুন ২০২০)