দুর্নীতি ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণে কোনো সফলতা নেই বাংলাদেশের
মো: মাজহারুল পারভেজ: ১৯৭৪ সালে তৎ’কালীণ রাষ্ট্রপ্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। ১৯৭৫ এর ১৫ জানুয়ারি রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স মাঠে পুলিশ বাহিনীর উদ্দেশে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আপনারা একবার আল্লাহর নামে প্রতিজ্ঞা করুন, আমরা দুর্নীতির ঊর্ধ্বে থাকব। প্রতিজ্ঞা করুন, আমরা দুর্নীতিবাজদের খতম করব। প্রতিজ্ঞা করুন, আমরা দেশকে ভালোবাসব, দেশের মানুষকে ভালোবাসব।’ কিন্তু সরকারের ভেতরে থাকা দুর্নীতিবাজরা এ আহ্বানে সাড়া দেননি। শেষ পর্যন্ত দুর্নীতিবাজদের ষড়যন্ত্রের কাছেই পরাজিত হয়েছে বাংলাদেশ।
শেখ মুজিব থেকে জিয়াউর রহমান:
বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে জিয়াউর রহমানের মেয়াদ শুরু হয়েছিল ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল। ১৯৮০ সালের শেষ দিক থেকেই শুরু হয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি। একই বছর রংপুর কারাগারে বিদ্রোহ শুরু হয়। পরে বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে দেশের বিভিন্ন কারাগারে। জিয়া নিহত হওয়ার অল্প দিন আগে ১৯৮১ সালের ৫ এপ্রিল দুর্নীতির দায়ে এক মন্ত্রী ও তিন প্রতিমন্ত্রীকে সরিয়ে দেন। ১৯৮১-এর ৩০ মে একটি সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে পরে জিয়াউর রহমান নিহত হন।
জিয়া থেকে এরশাদঃ
১৯৮৩ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ছিলেন এইচ এম এরশাদ। ক্ষমতা গ্রহণ করে তিনি দেশে জারি করেন সামরিক শাসন। স্থগিত করা হয় সংবিধান। সাইকেল চালিয়ে অফিসে গিয়ে তিনি ‘সততা’র প্রমাণ রাখতে চেয়েছিলেন। দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জেহাদ’ ঘোষণা করে ক্ষমতা দখল করে শুরু করেন দুর্নীতির মহোৎসব। বাংলাদেশের গণমাধ্যম সে সময় শৃঙ্খলিত ছিল। সে সময় বিদেশি প্রভাবশালী গণমাধ্যমে ‘দরিদ্র দেশের সবচেয়ে ধনী রাষ্ট্রপতি’ কিংবা মরিয়ম মমতাজের সঙ্গে এরশাদের প্রেম কাহিনি ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়। ফেয়ার ফ্যাক্স রিপোর্টে আসে এরশাদের দুর্নীতির আদ্যোপান্ত। চিনি চুরি, গম লুট করে দুর্নীতি ছড়িয়ে দেওয়া হয় সারা দেশে। শেষ পর্যন্ত এই দুর্নীতিবাজকেও বিদায় নিতে হয়।
১৯৯৬ এ আওয়ামীলীগ:
ওয়ার্ড পর্যায় থেকে কেন্দ্রীয় নেতাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির খবর ছড়িয়ে পড়ে। পাড়া মহল্লায় মাস্তানি, জবর দখল ও অপরাধের ঘটনা বেড়ে যায়। মানুষ একরকম জিম্মি হয়ে পড়ে। বেড়ে যায়, চাল, তেল, ডাল ও লবনের দাম। মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়ার ছেলের জমি দখল, ঢাকা থেকে নির্বাচিত আওয়ামী লীগের এক এমপির অস্ত্র হাতে মিছিলের ছবি। ফেনীতে জয়নাল হাজারী, লক্ষ্মীপুরের তাহের, নারায়ণগঞ্জের শামীম ওসমানের নানা রকম অনিয়মের খবর আসে গণমাধ্যমে। বিব্রত হয় আওয়ামী লীগ সরকার। এর প্রভাব পরে ২০০১-এর অক্টোবরের নির্বাচনে।
আওয়ামীলীগ থেকে আবার বিএনপি>
২০০১ সালে বিএনপি হাওয়া ভবন কেলেংকারী ,সরকারি চাকরিতে বদলি-নিয়োগ, টেন্ডার ইত্যাদি সবকিছু দুর্নীতিতে আক্রান্ত হয়। খাম্বা কেলেঙ্কারিসহ হাজারো দুর্নীতির কাহিনি প্রকাশিত হতে থাকে। বিএনপি অবশ্য এসব মোটেও আমলে নেয়নি, পাত্তাও দেয়নি। বিএনপি সরকারের আমলে ২০০১ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত টানা তিন বছর বাংলাদেশ দুর্নীতিতে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়।
বিএনপি থেকে আবার আওয়ামীলীগ
দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং দুর্নীতি প্রতিরোধকে অগ্রাধিকার দিয়ে টানা চতুর্থবারের মতো সরকার পরিচালনার দায়িত্ব নেয় আওয়ামী লীগ। কিন্তু দুর্নীতি কমেনি। পণ্যের বাজারে যেন আগুন লেগে গেছে। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকারের কোনো সাফল্য নেই। সাফল্য নেই দুর্নীতি প্রতিরোধেও।
তাই সাধারন মানুষের মনে একটা-ই প্রশ্ন- এ দেশ থেকে দুর্নীতি আর কবে কমবে, আর কবে এ দেশের মানুষ নিত্যদ্রব্যের বাজারে গিয়ে স্বস্তির নি:শ্বাস ফেলবে?
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী।