Dr

প্রশ্ন এখন মুক্তিযুদ্ধ, কোটা নয়

অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান: অত্যন্ত দুঃখের সাথে লক্ষ্য করলাম, গতরাতে ঢাকা, রাজশাহী, কুমিল্লা সহ বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গনে কোটা সংস্কার আন্দোলনের শিক্ষার্থীরা স্লোগান দিয়েছে, “তুমি কে, আমি কে, রাজাকার, রাজাকার”। এই মাটিতেই একাত্তরে শত শত শিক্ষার্থী, প্রথিতযশা অধ্যাপক  ড. গোবিন্দ চন্দ্র দেব, জ্যোতির্ময় গুহ ঠাকুরতা, অধ্যাপক সন্তোষ ভট্টাচার্য, ড. মনিরুজ্জামান, ড. শামসুজ্জোহাসহ ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়েছিলো। স্বাধীনতার ৫৩ বছর পরে মুক্তিযোদ্ধাদের রক্তে রাঙা এই মাটিতেই শিক্ষার্থীরা যখন গর্বিতভাবে নিজেকে  একেকজন ‘রাজাকার’ বলে পরিচয় দেয় তখন লজ্জায়  আমাদের মাথানত হয়।

এটা অত্যন্ত দুঃখজনক যে ‘রাজাকার’ শব্দটি বাঙালির কাছে এতকাল ধরে একটি ঘৃণাবাচক শব্দের সমার্থক হয়ে  আছে, যে শব্দ আমাদের ফেলে আসা তিক্ত এক ইতিহাসের কথা মনে করিয়ে দেয়, স্বাধীনতার ৫৩ বছর পর আজ দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে একদল তরুণ-তরুণী মাঝরাতে  সগর্বে স্লোগান দিচ্ছে ‘তুমি কে আমি কে, রাজাকার রাজাকার, ‘এই বাংলার মাটি, রাজাকারের ঘাঁটি। এই স্লোগান শোনার জন্যই কি ৭১ সালে আমরা বাংলাদেশ স্বাধীন করেছিলাম? তরুণ তরুণীরা নিজেদের আত্মমর্যাদা আর ইতিহাসকে ভুলে নিজেদের রাজাকার বলে স্লোগান দিতেও কুণ্ঠাবোধ করছে না। এই দেশই কি আমরা চেয়েছিলাম?

ছাত্রদের স্লোগানের কথাগুলো শুনে অত্যন্ত মর্মাহত হয়েছি। খুব কষ্টের সাথে বলতে হয় শিক্ষক হিসেবে হয়ত আমার ছাত্রদেরকে মাত্রা জ্ঞান শেখাতে পারি নি। আন্দোলন হচ্ছে  কোটার সংস্কার নিয়ে, সেখানে ছাত্রদেরকে কেন বলতে হবে যে তারা রাজাকার, কেন মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে অপমানজনক কথা বলতে হবে। এই কথা শোনার জন্যই  কি এখন  বেঁচে আছি! হুমায়নূ আহমেদ একটি নাটকে  ‘তুই রাজাকার’ পাখির মুখ দিয়ে বলিয়েছিলেন। সেই থেকে বাংলাদেশের আবালবদ্ধৃবনিতা সকলেই জানেন যে  রাজাকার একটি গালি এবং রাজাকাররা আমাদের স্বাধীনতাকে ধ্বংস করে দিতে চেয়েছিল। সেই রাজাকারদেরকে আজকে ছাত্ররা এভাবে স্বীকৃতি দেবে?

হ্যাঁ, আপনি আন্দোলন করছেন! একটি স্বাধীন দেশের  নাগরিক হিসেবে রাষ্ট্রের কাছে আপনারও অনেক কিছু চাইবার থাকে, আপনার অনেক দাবি থাকতেই পারে। রাষ্ট্র আপনাকে সাংবিধানিকভাবে কথা বলার, সভা সমাবেশ, মিছিল, মিটিং এমনকি আন্দোলন করার অধিকারও দিয়েছে। তবে তা যথেচ্ছ ব্যবহার করতে পারেন না। মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতা করা মানে বাংলাদেশের জন্মের বিরোধীতা করা। এর মানে হল তিরিশ লক্ষ শহিদের আত্বত্যাগ, দুই লক্ষ মা বোনের সম্ভ্রম ও লক্ষ লক্ষ মানুষের সংগ্রামকে অপমান করা।

বর্তমান সরকার অত্যন্ত সতর্কতার সাথে এবারের ছাত্র আন্দোলনকে মোকাবেলা করছে। একটি গণতান্ত্রিক দেশে এভাবেই যে কোন আন্দোলনকে মোকাবেলা করা উচিত কারণ সবারই তো আন্দোলন করার অধিকার আছে। ছাত্র নেতৃত্ব রাষ্ট্রপ্রধানের কাছে স্মারকলিপি জমা দিয়েছেন। জমা দিয়ে ২৪ ঘন্টার মধ্যে তাদের দাবি মানার আল্টিমেটাম দিয়েছে। যেখানে তারা জানে বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন  রয়েছে, সেখানে তারা কি করে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠানকে আল্টিমেটাম দেয়?

গত কয়েকদিন বাংলাদেশের পত্রপত্রিকায় এ সংক্রান্ত বেশ কয়েকটি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে যে, কোটা সমস্যার মীমাংসা আদালতের ব্যাপার নয়। অর্ধসত্য তথ্যে ভরা এই লেখাগুলো আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের আরো বেশি বিভ্রান্ত করেছে। আমি খুব স্পষ্ট করে বলতে চাই যে, কোটা সমস্যার মীমাংসা এখন আদালতের বিষয়। বাংলাদেশের মৌলিক অধিকারের সাথে সম্পৃক্ত যে কোন বিষয়ের সাংবিধানিকতা যাচাই করার দায়িত্ব  আদালতের। দেশের মহামান্য প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান শিক্ষার্থীদের আইনজীবীর মাধ্যমে তাদের বক্তব্য আদালতের সামনে তুলে ধরার  আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ আইন অনুযায়ী হাইকোর্টের রায় বহাল, বাতিল বা  সংশোধন করতে পারেন। এখন তাই আমাদের ধৈর্য্য ধরে  আদালতের রায়ের জন্যে অপেক্ষা করতে হবে।

কিন্তু বিষয়টি এখন আর শুধু কোটার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। গতরাতে শিক্ষার্থীদের স্লোগানের মাধ্যমে বোঝা গেছে যে কিছু সুযোগ সন্ধানী মহল এই আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে  প্রবাহিত করতে ইন্ধন যোগাচ্ছে। আন্দোলনটি আর সাধারণ শিক্ষার্থীদের হাতে নেই বরং এটি স্বাধীনতা বিরোধীদের হাতে চলে গেছে। এটি মেনে নেয়া কষ্টের। একই সঙ্গে যারা নিজেদেরকে রাজাকার বলে পরিচয় দিচ্ছে তাদের কোন অধিকার নেই শহীদের রক্তস্নাত পতাকা মাথায় জড়িয়ে আন্দোলন করার। আমরা এ ধরণের নেতিবাচক মেধার  সরকারি কর্মচারী চাই না। আমরা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের সরকারি কর্মচারী চাই। এমন ছাত্র চাই যাদের মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধা রয়েছে। বাংলাদেশের প্রতি আনগত্য রয়েছে। কেননা তরুণ প্রজন্ম এবং এই ছাত্র সমাজই আমাদের আস্থার শেষ ঠিকানা। তাই তাদের থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে এই বাক্যবান এবং ‘রাজাকার’  শব্দটিকে মহিমান্বিত করার চেষ্টা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী একজন নাগরিক হিসেবে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বুয়েটের ভিসির কাছে জানতে চাই এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে জবাব চাই কারা এ ধরনের স্লোগান দেয়, তাদের পারিবারিক ইতিহাস কি! রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে এটা জানার অধিকার আমার আছে। কার্ল মার্ক্স বলেছিলেন, “ইতিহাস নিজেকে পুনরাবৃত্তি করে। প্রথমে ট্র্যাজেডি হিসেবে, দ্বিতীয়ত প্রহসন হিসেবে।”  আমাদের একাত্তরের ট্র্যাজেডিকে একদল শিক্ষার্থী প্রহসনে পরিণত করলো নিজেদেরকে রাজাকার অভিহিত করে। এর  বিরুদ্ধে জোরালো প্রতিবাদ না হলে সমাজে ভুল দৃষ্টান্ত সৃষ্টি হবে এবং এর মাধ্যমে স্বাধীনতার বিপক্ষের শক্তি আবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠবে।

লেখক: সাবেক চেয়ারম্যান, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন।

বিনিয়োগবার্তা/ডিএফই/এসএএম//


Comment As:

Comment (0)