মিহির স্যার

সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি ও প্রাসঙ্গিক প্রস্তাবনা

ড: মিহির কুমার রায়: বাংলাদেশ ব্যাংক চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ের মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে গত ১৮ই জুলাই। এতে বলা হয়, অর্থনীতিতে ঘুরে দাড়ানোর লক্ষণ থাকলেও এখনও উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে মূল্যস্ফীতি। এ কারণে মূল্যস্ফীতির অবস্থান সংকোচনমূলক থাকবে। সরকার মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশে কমলেও বাংলাদেশে এখনও উচ্চ মূল্যস্ফীতিই রয়েছে। এর অন্যতম কারণ অন্য দেশের তুলনায় অনেক দেরিতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অনেক দেরিতে এসে ডলারের দর ও সুদহার বাড়ানো হয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশে কেবল মুদ্রা সরবরাহের কারণেই মূল্যস্ফীতি বাড়ে-কমে তেমনটি নয়। এখানে বাজার ব্যবস্থাপনাসহ অনেক বিষয় জড়িত। ফলে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির পাশাপাশি অবশ্যই বাজার তদারকি জোরদার করতে হবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০২৩-২৪ অর্থবছর বাজেটের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৭ শতাংশে রাখার ঘোষণা দিয়েছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তবে গত জুন শেষে গড় মূল্যস্ফীতি ঠেকেছে ৯ দশমিক ৭৩ শতাংশে। চলতি অর্থবছর মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৬ শতাংশে সীমিত রাখার লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছে। আর এজন্য ডলার বিক্রির মাধ্যমে বাজার থেকে টাকা উত্তোলনের পাশাপাশি সরকারকে টাকা ছাপিয়ে ধার দেওয়া বন্ধ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। অবশ্য সঙ্কটে থাকা কয়েকটি ব্যাংককে নানা উপায়ে ধার দেওয়ায় মুদ্রা সরবরাহ কাঙ্খিত মাত্রায় নিয়ন্ত্রণে থাকছে না। অর্থনীতিবিদদের অনেকে বলছেন, বর্তমান বাস্তবতায় সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির বিকল্প নেই। কেননা এখন দেশে  মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণই প্রধান অগ্রাধিকার। যে কারণে বাজারে মুদ্রা সরবরাহ কমাতে হবে। পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনতে এ সম্পর্কিত অন্য বিষয়েও সরকারকে নজর দিতে হবে।

টালমাটাল বৈশ্বিক পরিস্থিতি ও অভ্যন্তরীণভাবে আমাদের কিছু দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতি নানা দিক থেকেই একটা চ্যালেঞ্জিং সময় অতিক্রম করছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, মার্কিন ডলারের পাশাপাশি স্থানীয় টাকার সংকট, বৈদেশিক লেনদেনে ভারসাম্যহীনতা এবং সুশাসনের অভাবে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির সঙ্গে নিয়ন্ত্রণহীন ব্যাংক খাত-মোটা দাগে এই  সবই হচ্ছে এখন দেশের আর্থিক খাতে প্রধান সমস্যা। এসব চ্যালেঞ্জ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা আছে মুদ্রানীতিতে। এ রকম প্রেক্ষাপটে সরকার ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেট পাস করেছে। মুদ্রানীতির দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে নতুন অর্থবছরের বাজেটের বেশ কিছু ইতিবাচক দিক রয়েছে, যেমন ১. বর্তমান বাস্তবতার নিরিখে বাজেটের আকার ছোট রাখা; ২. মূল্যস্ফীতির চাপ নিরসনে বেশ কিছু নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ পর্যায়ে উৎসে কর কমানো; ৩. সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ব্যয় বাড়ানো ইত্যাদি। তথাপি বাজেটে রাজস্ব আয় বাড়াতে অনেকটাই গতানুগতিক পন্থা অবলম্বন এবং ঘাটতি মোকাবেলায় ব্যাংক খাতের ওপর অতি নির্ভরতা মুদ্রানীতি ও রাজস্ব নীতির ক্ষেত্রে এরই মধ্যে যেসব চ্যালেঞ্জের সৃষ্টি করেছে এবং সামনের মাসগুলোয়ও যেসব চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করতে পারে তা চিহ্নিত করা এবং তা থেকে উত্তরণের সম্ভাব্য কিছু পথ কি হতে পারে তা আলোচনার দাবি রাখে যা ঘোষিত মুদ্রানীতিতে স্বচ্ছ নয়।

চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথমার্ধের মুদ্রানীতিতে নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রেখেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ফলে ব্যাংক ঋণের  সুদের হারের যে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা রয়েছে, তা কিছুটা শ্লথ হবে বলে মনে করা হচ্ছে। নীতি সুদহার আর না বাড়ানোর পক্ষে অবস্থান নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তবে আমদানি ঋণপত্র খোলার ক্ষেত্রে কড়াকড়ি বা বিধিনিষেধ শিথিল করার ঘোষণা  দিয়েছে সংস্থাটি। মুদ্রানীতিতে বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, এখন থেকে গাড়ি, ফলমূল, ফুল ও প্রসাধনী আমদানির ক্ষেত্রে  শুধু ঋণপত্রের বিপরীতে নগদ অর্থ জমা দিয়ে এসব পণ্য আমদানি করতে হবে। এর বাইরে অন্য পণ্য আমদানিতে অগ্রিম অর্থ  জমার বিষয়টি শিথিল করা হবে। নতুন মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতের ঋণের প্রবৃদ্ধি আগের মতো রাখা হয়েছে। গত জুন পর্যন্ত বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে ৯ দশমিক ৮ শতাংশ। আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত বেসরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধির  এ হারই বহাল রাখা হয়েছে। অন্যদিকে সরকারি খাতের ঋণের প্রবৃদ্ধি জুন শেষে দাঁড়িয়েছে ১২ দশমিক ৮ শতাংশ।  নতুন মুদ্রানীতিতে সরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা আরও বাড়িয়ে ১৪ দশমিক ২ শতাংশ করা হয়েছে। অর্থাৎ ব্যাংক খাত  থেকে সরকারকে আরও বেশি ঋণ গ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংক নতুন টাকা ছাপিয়ে (রিজার্ভ  মানি) মুদ্রার সরবরাহ বাড়াবেনা বলে ঘোষণা দিয়েছে। জুনে রিজার্ভ মানির প্রবৃদ্ধি ছিল ৭ দশমিক ৯ শতাংশ। ডিসেম্বরে এ  প্রবৃদ্ধি কমিয়ে ২ শতাংশ নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

মুদ্রানীতি পর্যালোচনায় দেখা যায় যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক মুদ্রানীতি নিয়ন্ত্রন করতে চাচ্ছে মুদ্রানীতির হাতিয়ারকে ব্যবহার করে এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে (বহু বিলম্বে) সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি গ্রহণের কথা উল্লেখ করে আগামী বছর মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৬ শতাংশে নেমে আসবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে বাজেটে। তবে কী উপায়ে (ব্যয় বৃদ্ধিজনিত) মূল্যস্ফীতি কমবে, সে বিষয়ে নেই কোনো পথ নির্দেশ। কারণ সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি দিয়ে চাহিদাজাত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা যায়, ব্যয় বৃদ্ধিজনিত মূল্যস্ফীতি নয়। আগের বছরের বাজেটে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী অকপটে স্বীকার করেছিলেন, ২০২২ সালের আগস্টে মূল্যস্ফীতি ৯.৫ শতাংশ থাকলেও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতি ৫.৬ শতাংশের মধ্যে সীমিত রাখা সম্ভব হবে না। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সদ্য বিদায়ী ২০২৩-২৪ অর্থবছরের গড় মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৯ দশমিক ৭২ শতাংশ, যা অর্থবছরওয়ারি হিসাবে অন্তত এক যুগের মধ্যে সর্বোচ্চ। পুরো বছরে কোনো মাসেই সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের নিচে নামেনি। অন্যদিকে জাতীয় মজুরি হার বেড়েছে সাড়ে ৭ শতাংশের মতো। এক বছর ধরেই খাদ্যপণ্যে মূল্যস্ফীতি বেশি খারাপ অবস্থায় ছিল। গত ১২ মাসের মধ্যে সাত মাসই খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশের ওপরে ছিল। গত বছরের আগস্ট মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১২ দশমিক ৫৪ শতাংশে উঠেছিল, যা অর্থবছরের সর্বোচ্চ। গত অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি নির্ধারিত ৬ শতাংশে রাখার লক্ষ্য থাকলেও এর ধারে কাছেও যেতে পারেনি।

বর্তমান বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে অন্যান্য দেশে গৃহীত পদক্ষেপের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির অংশ হিসেবে সুদের হারের ঊর্ধ্বসীমা অবলুপ্ত করা এবং ঋণের চাহিদা ও তহবিল সরবরাহের ভিত্তিতে সুদের হার নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। তবে এ কাজটি যে যথাসময়ে করা হয়নি এবং সে কারণে তার সুফল যে সহসা মিলবেনা, সেটি স্বীকার করা হয়নি।  টাকা-ডলার বিনিময় হারকে বাজারভিত্তিক করার পদক্ষেপ হিসেবে ‘ক্রলিং পেগ’ পদ্ধতি প্রবর্তনের মাধ্যমে বিদেশি রেমিট্যান্স এবং রপ্তানি আয় বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে। আশা করা হয়েছে, এতে রিজার্ভ বাড়বে এবং এর ফলে টাকার বিনিময় হার অনুকূল হতে শুরু করবে। ঋণ ছাড়ের জন্য এই শর্তটি আইএমএফ শিথিল করলেও তাতে আত্মতৃপ্তিতে ভোগার কোনো অবকাশ নেই। দেশের আর্থিক খাতকে রক্ষা করতে হলে এ বিষয়ে সরকারকে কঠোর থেকে কঠোরতম অবস্থান নিতে হবে। কোনো প্রভাবশালী বা ক্ষমতাবান মহলকে ছাড় দেওয়ার জন্য দেশের অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দু আর্থিক খাতকে সংকটাপন্ন করে তোলা দেশ, অর্থনীতি ও সরকারের জন্য কোনোভাবেই মঙ্গলজনক হবে না। বাজেট বক্তৃতার এই পদক্ষেপগুলোর সুফল যদি আদৌ মেলে, তার জন্য বিশেষ করে মূল্যস্ফীতি কমার জন্য সাধারণ মানুষকে অপেক্ষায় থাকতে হবে কমপক্ষে আরও কিছু সময়। তত দিনে দারিদ্রসীমার নিচে নেমে যাবে আরও বহু নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবার, প্রকটতর হবে আর্থিক বৈষম্য।
 
পর্যালোচনা করলে আরও দেখা যায় যে, সাম্প্রতিককালে ব্যাংক খাতে নগদ তারল্যের যে অবস্থা চলছে তার জন্য সরকারি- বেসরকারি খাতে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় ঋণের প্রবৃদ্ধি বহুলাংশে দায়ী। বেশ কয়েক বছর আমানতের- ঋণের সুদহার ৬-৯ শতাংশে সীমিত থাকায় আমানতের প্রবৃদ্ধি ক্রমান্বয়ে শ্লথ হওয়ার বিপরীতে ব্যক্তি খাতে ঋণের চাহিদা ও প্রবৃদ্ধি দ্রুত বৃদ্ধি  পায়। পাশাপাশি করোনা-পরবর্তী সময়ে আমদানি ব্যয়ও অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়। ফলে সার্বিকভাবে দেশের লেনদেন ভারসাম্যের ঘাটতিও মাত্রাতিরিক্তভাবে বৃদ্ধি পায়, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ধস এবং ব্যাপক মুদ্রা সরবরাহে শ্লথ প্রবৃদ্ধির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এমনকি আমানত ও  ঋণের ওপর আরোপিত সুদহারের পরিসীমা প্রত্যাহার এবং আমদানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাওয়া সত্ত্বেও অভ্যন্তরীণ এবং বৈশ্বিক নানা কারণে লেনদেন ভারসাম্যে ঘাটতির ফলে দেশের ব্যাংক খাতে নিট বৈদেশিক সম্পদ হ্রাস ও ব্যাপক মুদ্রা  সরবরাহের শ্লথ প্রবৃদ্ধির এ ধারা এখনো অব্যাহত রয়েছে। মুদ্রা সরবরাহের শ্লথ প্রবৃদ্ধির বিপরীতে আমাদের অর্থনীতিতে জিডিপি প্রবৃদ্ধির ধারা বজায় রাখতে সরকারের উন্নয়ন বাজেটের ঘাটতি মোকাবেলায় সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ব্যাংক খাত থেকে নিট ঋণ গ্রহণের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তাই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে শুধু সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির ওপর নির্ভর না করে বাজার ব্যবস্থাপনাকে উন্নত করতে হবে। বেরিয়ে আসার চেষ্টা করতে হবে ডলার সংকট থেকে। চলতি বছর অর্থনীতিতে যেসব সংকট রয়েছে, সেগুলোর বেশির ভাগই ২০২৩ সাল থেকে এসেছে। তাই, ২০২৪ এর নির্বাচিত গনতান্ত্রিক সরকারের কাছে তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ যথা- প্রথমত: বানিজ্য সহায়ক অবকাঠামো নির্মান করে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করা: দ্বিতীয়তঃ স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতির দীর্ঘমেয়াদি সমাধান খুঁজে বেড় করা এবং তৃতীয়তঃ সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সরকারী প্রতিষ্ঠান বিশেষত: ব্যাংকগুলোকে শক্তিশালী করা ও রাজনৈতিক প্রভাব মুক্ত রাখা। এই গুলোর সমাধানকল্পে সরকারের অবশ্যি উৎসাহের কোন ঘাটতি থাকার কথা নয় যদি মুদ্রানীতির সফল বাস্তবায়ন দেখতে চায় এবং দারিদ্র মুক্ত বাংলাদেশ গড়তে চায়। কাজেই এই সকল সমস্যাগুলো সমাধানকল্পে মুদ্রানীতিতে আলেচিত বিষয়গুলো বিবেচনায় আনতে হবে। তাহলেই দেশের কাঙ্খিত প্রবৃদ্ধি অর্জন, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি সম্ভব হবে।

লেখক: অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ।

বিনিয়োগবার্তা/ডিএফই/এসএএম//


Comment As:

Comment (0)