এসডিজি অর্জনে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও অঙ্গীকার জরুরী

আশফিকুর রহমান: উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের ছাত্র হিসেবে টেকসই উন্নয়ন ও সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা পড়াশোনা করতে হচ্ছে। এ নিয়ে প্রবন্ধ, সম্পাদকীয় প্রভৃতি অনেক প্রকাশিত হয়েছে, ভবিষ্যতেও হবে। গঠনমূলক সমালোচনা ও নিরপেক্ষ মতামতও আমরা দেখেছি। সৃষ্টির শুরু থেকে জ্ঞান-বিজ্ঞানের বহুমুখী উন্নয়ন ও নানা ধরনের আবিষ্কারের মাধ্যমে সুন্দর এই পৃথিবীকে সুন্দরতর ও বাসযোগ্য করে গড়ে তোলার জন্য সংগ্রাম চলছে। উদ্ভাবনী ক্ষমতা ও চিন্তা দ্বারা পরস্পরের সাহায্যের হাত অগ্রসর করে চলেছে এককেন্দ্রিক চিন্তা পরিহার করে। এ ধারণা থেকেই আমরা এমডিজি বা এসডিজি পেয়েছি।

টেকসই উন্নয়ন কাকে বলে, সেটা আমরা ইতোমধ্যে বিভিন্ন মাধ্যমে জেনেছি বা জানি। এমনকি ১৯৮৭ সালে বার্টল্যান্ড কমিশনের দেওয়া সংজ্ঞাও অনেকে জানেন।

টেকসই উন্নয়নের একটা সংজ্ঞার আলোকেই আজকের লেখা। সংজ্ঞার উৎস মনে নেই। সংজ্ঞাটি হলো Sustainable development is the process of human construction, growth and consumption that can be maintained with the minimal damage to natural environment. এই সংজ্ঞার মধ্যে চারটি বিষয় রয়েছে। তার মধ্যে দুটি হচ্ছে ‘প্রবৃদ্ধি বা উন্নয়ন (গ্রোথ)’ ও ‘ভোগ (কনজাম্পসন)’।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বা উন্নয়ন দুটি প্রায় একই অর্থ বহন করে, যদিও কিছু পার্থক্য দেখিয়েছেন অনেক অর্থনীতিবিদ। যেমন ম্যাডিসন বলেছেন, ‘ধনী দেশের আয় স্তরের বৃদ্ধিকে সাধারণত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বলা হয় এবং দরিদ্র দেশে এটাকে বলা হয় অর্থনৈতিক উন্নয়ন।’ তিনি বলতে চেয়েছেন অর্থনৈতিক উন্নয়ন অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের সমস্যা এবং প্রবৃদ্ধি উন্নত দেশের সমস্যা (এমএল ঝিঙ্গান, পৃষ্ঠা: ৪)। সে যাই হোক, কেন এ কথাÑকারণ সব রাষ্ট্র এই উন্নয়নের দিকে ছুটছে, বাড়াতে চাইছে তাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বা উন্নয়ন। প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে নতুন নতুন শিল্পকারখানা প্রতিষ্ঠাসহ বিনিয়োগ বাড়ছে প্রতিবছর। আর এরই ধারাবাহিকতায় বাড়ছে রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে প্রতিযোগিতা ও দ্বন্দ্ব, যার ফলে বিনিয়োগ বাড়ছে পারমাণবিক অস্ত্রের উন্নয়নসহ সামরিক ব্যয়ে। পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের তথ্যানুসারে ২০১৬ সালে সামরিক ব্যয় বাবদ সারা বিশ্ব ১.৬৯ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার খরচ করেছে এবং শুধু যুক্তরাষ্ট্রই ব্যয় করেছে ৬১১ বিলিয়ন ডলার। এটি ২০১৫ সালের তুলনায় ১.৭ শতাংশ বেশি এবং অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়ে ২০১৮ সালে সেই ব্যয় ১০ শতাংশ বৃদ্ধির প্রস্তাব করেছে বর্তমান ট্রাম্প প্রশাসন (সূত্র: বিবিসি বাংলা, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৭)। চীন, সৌদি আরব, ভারত, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ফ্রান্সÑব্যয় বৃদ্ধি করে চলেছে। ২০১৬ সালে মোট বৈশ্বিক উৎপাদনের ২.২ শতাংশ সামরিক খাতে ব্যয় করা হয়েছে, যা জনপ্রতি হিসাবে ২২৭ ডলারের সমান  (সূত্র: ডেইলি স্টার, ৬ জানুয়ারি ২০১৮)।

ভোগবাদী বিশ্ব নিয়ে কিছু কথা। বর্তমান বিশ্ব ত্যাগটাকে সত্যিই ত্যাগ করেছে, তা না হলে ১৯৭৫ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত পৃথিবীতে মোটা বা অতিরিক্ত ওজনের মানুষের পরিমাণ প্রায় তিন গুণ বেড়েছে। ২০১৬ সালের একটা জরিপে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে, পৃথিবীতে মোট ১৯০ কোটি অতিরিক্ত ওজনের মানুষ আছে, যার মধ্যে ৬৫ কোটি অতিকায় মোটা, যেটা ক্রমেই বাড়ছে। আর এই পরিসংখ্যানে চীন ও যুক্তরাষ্ট্র এগিয়ে আছে। শুধু চীন ও যুক্তরাষ্ট্রে যথাক্রমে ৪৬.৪ ও ৪৩.২ এবং ৪৬.১ ও ৪১.৭ মিলিয়ন নারী ও পুরুষ অতিরিক্ত মোটা। পক্ষান্তরে ইমপেরিয়েল কলেজ লন্ডন বলছে, ১৯৭৫ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত মোটা বা অতিরিক্ত ওজনের মানুষের সঙ্গে সঙ্গে অপরিণত ওজনের মানুষের সংখ্যাও বাড়ছে। তার দেখিয়েছে, ঠিক এই সময়ে পৃথিবীর অন্য অংশে ৩৩ কোটি থেকে ৪৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ অপরিণত ওজনের। ইউএনএফপি এক প্রতিবেদনে বলেছে, ১৯৫০ সালে যেখানে পৃথিবীতে প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ বা ব্যবহার হয়েছে মাত্র এক হাজার টন, ২০১০ সালে তা সাত হাজার টনে দাঁড়িয়েছে। ২০১৩ সালে অর্থনীতিবিদ ওয়েডম্যান বলেছেন, আগামী ২০৫০ সাল নাগাদ প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ ও ব্যবহার ২২ হাজার ৫০০ থেকে ২৭ হাজার টন হবে। তিনি উল্লেখ করেছেন, মানুষের ভোগবিলাসী জীবনযাপন ও প্রযুক্তির উন্নয়ন।

এটা স্বীকার্য, এসডিজি এমডিজির উত্তরাধিকার বা মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। পক্ষান্তরে অনেকে এসডিজি’কে আরও উন্নত ও সময়োপযোগী এবং কাক্সিক্ষত বলেও মনে করেন।  প্রশ্ন উঠবে, এসডিজি কীভাবে পরিমাপ করবেন? কে দেবে এর তহবিল? এত অল্প সময়ে কীভাবে অতিদারিদ্র্য, সবার জন্য শিক্ষা বা খাদ্য কীভাবে নিশ্চিত হবে প্রভৃতি! যেখানে এমডিজির আটটি লক্ষ্যের ৫০ শতাংশের কম বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হয়েছে ১৪০টি দেশের মধ্যে ৮৬টি দেশ, ৩০টি দেশ ৫০ থেকে ৫৯ শতাংশ, ১৮টি দেশ ৬০ থেকে ৬৯ শতাংশ এবং বাকি ছয়টি দেশ ৭০ থেকে ৭৭ শতাংশ বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হয়েছে, যদিও এ নিয়ে দ্বিমতও কম নেই যে অদৌ তারা কতটুকু বাস্তবায়ন করেছে (সূত্র: এমডিজি ট্র্যাক গ্লোবাল ইনডেক্স)। আর্থিক সক্ষমতা এসডিজি অর্জনের মূল প্রতিবন্ধকতা হলেও প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত, সুশাসন, সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগের সহাবস্থান এবং সর্বোপরি উন্নত বিশ্বের সাহায্য ও ভোগবিলাসী জীবন থেকে সরে আসা ছাড়া এর অর্জন মোটেই সম্ভব নয়।

বাংলাদেশে ওপরের সব প্রতিবন্ধকতা বা চ্যালেঞ্জ এখানে বিদ্যমান। ২০১৬ সালের এপ্রিলে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) প্রকাশিত “Setting Priorities for Data Support to 7th FYP and SDs: An overview” শীর্ষক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী এসডিজির ১৬৯টি টার্গেটের মধ্যে কেবল ৪৮টির বিষয়ে বিবিএসের কাছে সম্পূর্ণ বা আংশিক তথ্য রয়েছে। এর মধ্যে ৬, ৯, ১১ ও ১৬নং এসডিজি সংশ্লিষ্ট সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ টার্গেটসম্পর্কিত প্রাথমিক তথ্য বিবিএস কর্তৃক সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে এবং ৭, ১২, ১৪, ১৫ ও ১৭নং এসডিজি সংশ্লিষ্ট টার্গেটগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়/বিভাগ থেকে বিবিএস কোনো তথ্যই সংগ্রহ করতে পারেনি। ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী এসডিজি ৯ (শিল্পায়ন, উদ্ভাবন ও অবকাঠামো) ও এসডিজি ১২-এর (টেকসই উৎপাদন) মতো তাৎপর্যপূর্ণ লক্ষ্যগুলো এখন পর্যন্ত জাতীয় অগ্রাধিকার প্রক্রিয়ায় যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হয়নি।  প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও এসডিজি হতে পারে মানুষের আলোর কাছে চাবি হাতড়ানোর মতো। সর্বোপরি পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ব্যবস্থা থেকে শুরু করে বণ্টনে আনতে হবে পরিবর্তন।

সত্তরের দশকে বিজ্ঞানী ও অর্থনীতিবিদরা যে ‘লিমিটস টু গ্রোথ’ ধারণার প্রবর্তন করেছিলেন, সেজন্য সামাজিক ও মানবিক দায়বদ্ধতার পাশাপাশি অর্থনৈতিক নীতিমালায় পরিবর্তন আনতে হবে। কারণ এটাই পারে, আমাদের ভোগবিলাসী জীবন পরিহার করতে হবে। এজন্য দরকার আগামী প্রজন্ম ও আমাদের আবাসকে নিরাপদ রাখতে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও অঙ্গীকার।

লেখক: আশফিকুর রহমান, শিক্ষার্থী, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়।


Comment As:

Comment (0)


Loading...