কর্মসংস্থানের গতি-প্রকৃতি

ড. মিহির কুমার রায়:  প্রবৃদ্ধি, উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও আয় এই চারটি অর্থনৈতিক চলকের মধ্যে সুসম্পর্ক থাকতে হবে অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বার্থে। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমানে এই চারটি চলকের মধ্যে তেমন কোনো সমন্বয় পরিলক্ষিত নয়।

বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিস বলছে, দেশে যে হারে জিডিপি বাড়ছে সে হারে কর্মসংস্থান বাড়ছে না। বর্তমানে বছরে গড়ে ১১ লাখ অভ্যন্তরীণ কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে অথচ উচ্চ প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশা পূরণ করতে হলে বাংলাদেশের গড়ে ১৬ লাখ কর্মসংস্থান তৈরি করতে হবে।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ কর্তৃক ২০১৭-১৮ সালে ঘোষিত বাজেটে জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার টার্গেট করা হয়েছিল ৭.৫% এবং সরকারি ভাষ্য মতে, এখন পর্যন্ত অর্জিত হয়েছে ৭.২%-এর বেশি। আবার মাথাপিছু আয় গত বছরের তুলনায় বেড়ে বর্তমানে ১৭৫২ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। মূল্যস্ফীতি ৬%-এর নিচে রয়েছে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৮০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এই বিশাল রিজার্ভ দেশের কর্মসংস্থান, উৎপাদন কিংবা প্রবৃদ্ধিতে কীভাবে কতটুকু কাজে লাগছে বা লাগানো হচ্ছে তা নিয়ে তেমন আলোচনা শোনা যাচ্ছে না। তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন প্রবৃদ্ধি, উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও আয় এই চারটি অর্থনৈতিক চলকের মধ্যে সুসম্পর্ক থাকতে হবে অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বার্থে। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমানে এই চারটি চলকের মধ্যে তেমন কোনো সমন্বয় পরিলক্ষিত নয়।

বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিস বলছে, দেশে যে হারে জিডিপি বাড়ছে সে হারে কর্মসংস্থান বাড়ছে না। বর্তমানে বছরে গড়ে ১১ লাখ অভ্যন্তরীণ কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে অথচ উচ্চ প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশা পূরণ করতে হলে বাংলাদেশের গড়ে ১৬ লাখ কর্মসংস্থান তৈরি করতে হবে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) বিগত ২০১৬-১৭ অর্থবছরের তথ্য মতে, দেশে ১০.৯১ কোটি ১৫ বছরের বেশি বয়সী মানুষ রয়েছে যার মধ্যে বেকার মানুষের সংখ্যা ২৬.৮০ লাখ। আবার উচ্চ শিক্ষিত বেকারের হার মোট বেকারত্বের ১১.২ শতাংশ এবং প্রতি বছরে ২০ লাখ মানুষ কর্মের বাজারে প্রবেশ করছে অথচ সে পরিমাণে কর্ম সৃষ্টি হচ্ছে না। প্রাথমিক স্তরের শিক্ষা আছে এমন লোকদের কর্মহীনতার হার ২.৭ শতাংশ অর্থাৎ যে যত বেশি শিক্ষা গ্রহণ করছেন তার বেকারত্বের সম্ভাবনা তত বেশি সৃষ্টি হচ্ছে। আবার আঞ্চলিক বৈষম্য বেড়েছে, শহরের চেয়ে গ্রামে বসবাসকারী লোকদের আয় কমছে ও নারীদের আয় কমছে পুরুষের তুলনায়। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বলেছেন কর্মসংস্থান যা হচ্ছে প্রায় সবটুকুর দাবিদার অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত যার পুরোটা ধরেই রয়েছে সরকারি বিনিয়োগের প্রভাব যেখানে সমাজের সাধারণ মানুষ তথা দুর্বল শ্রেণি খুব একটা সুফলের অংশীদার হবে না। আবার প্রবৃদ্ধির হিসাবে জিডিপির অনুপাতে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়েনি অর্থাৎ মুদ্রানীতির উল্লিখিত ব্যাংক কর্তৃক বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ১৬.৩ শতাংশ ছাড়িয়ে ১৮.৫ শতাংশ হওয়ায় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে বিনিয়োগ বাড়ল না অথচ ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অতিক্রম হলো তা হলে টাকা গেল কোথায়? প্রশ্ন এই বিনিয়োগের মান নিয়ে যা অনেক ক্ষেত্রে অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যয়িত হওয়ার সম্ভাবনা বিদ্যমান। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, বর্তমানে আর্থিক বছরের সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে এডিপি ১ লাখ ৫৭ হাজার ৫৯৪ কোটি ৩৯ লাখ টাকার বরাদ্দ রেখেছে এবং বিগত নয় মাসে (জুলাই-মার্চ) ৪৫ শতাংশ অর্থ ব্যয়িত হয়েছে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে। বছরের বাকি তিন মাসের মধ্যে আশা করা যায় ৫৫ শতাংশ অর্থ ব্যয়িত হবে অন্যান্য উন্নয়ন প্রকল্পে। এই বিনিয়োগ কতটুকু কর্মসংস্থান সহায়ক হবে তা সরকারি সংস্থা বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) বলে দেবে সময়ান্তে। তবে অভিজ্ঞতা বলছে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে অধিক ভ‚মিকা রাখে তুলনামূলকভাবে সরকারি খাতের চেয়ে এবং দেশের বিপুল জনসংখ্যাকে বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে কর্মক্ষেত্র তৈরি করতে হবে এবং দক্ষ জনশক্তি হিসেবে তাদের যদি গড়ে তোলা যায় তাহলে অভীষ্ট প্রবৃদ্ধি অর্জন করা সম্ভব হবে।

দেশের জনসংখ্যার একটি বড় অংশ যুবক শ্রেণি ১৮-৩৫ বছরে সীমাবদ্ধ তাদের যদি ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ মাধ্যমে উদ্যোক্তা উন্নয়নে উদ্বুদ্ধ করা যায় তা হলে উৎপাদন বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও আয়ে দেশ সমৃদ্ধ হবে যা জিডিপি বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। কিন্তু সমস্যাটা হলো আর্থিক খাতের ব্যাংকিংয়ের অংশ নিয়ে এবং তারল্য সংকট, খেলাপি ঋণের সংকট, ব্যাংকের গ্রাহকের তিক্ত সম্পর্ক ইত্যাদি ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ তথা কর্মসৃষ্টি কার্যক্রমকে ব্যাহত করছে যার সঙ্গে প্রবৃদ্ধি সম্পর্ক যুক্ত। তারল্য সংকটের প্রধান কারণ খেলাপি ঋণ ও এডিআর এ সামঞ্জস্যতা বজায় না রাখা অর্থাৎ ডিপোজিটের চেয়ে অগ্রিম বেশি যা বিধি মোতাবেক মোট ডিপোজিটের শতকরা ৮৫ ভাগ পর্যন্ত অগ্রিম দেয়ার দাপ্তরিক নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু অনেক ব্যাংক সেই সীমা অতিক্রম করে বেশি বিনিয়োগ করছে যার প্রমাণ বেসরকারি খাতে পরিচালিত ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লি. (আইবিবিএল) যাদের বিনিয়োগ এখন প্রতিষ্ঠান নীতি-নির্ধারকরা বন্ধ করে দিয়েছে। সম্প্রতি একটি দৈনিক পত্রিকায় খবর এসেছে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ৪টি ব্যাংকের (সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী) মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ২৮,৯৫৬ কোটি টাকা এবং সার্বিক ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা যা মোট বিনিয়োগকৃত ঋণের শতকরা ১২ ভাগ যাকে অনেকে মহাবিপদ সংকেত বলে আখ্যায়িত করছেন।

এই ঋণ খেলাপি ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগকে বাধাগ্রস্ত করে, মূলধন ঘাটতিতে সহায়তা করে এবং ব্যাংকের মুনাফা কমিয়ে দেয় তথা গ্রাহকদের আস্থা হারায়। অতি সম্প্রতি এই তারল্য সংকটের মোকাবেলায় বেসরকারি ব্যাংকের সংগঠন অর্থমন্ত্রীর কাছে দুটি দাবি উত্থাপন করেন- (১) বর্তমানে প্রচলিত সিআরআর ৩ শতাংশ কমিয়ে আনা; (২) সরকারি ফান্ডের অর্ধেক বেসরকারি ব্যাংকে গচ্ছিত রাখা। এই দাবির প্ররিপ্রেক্ষিতে সরকার বর্তমানে প্রচলিত সিআরআর ৬.৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫.৫ শতাংশ অর্থাৎ ১ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছে কোনো হিসাবপত্র ছাড়াই এবং এতে করে ১০ হাজার কোটি টাকা ব্যাংকিং চ্যানেলে চলে এসেছে তারল্য সংকটের ঘাটতি মোকাবেলায় যা ব্যক্তি বিনিয়োগ বাড়তি শক্তি জোগাবে।

কিন্তু অনেক বিশ্লেষক বলছেন, এই সিদ্ধান্ত ব্যাংকিং খাত তথা অর্থনীতির জন্য এক অশনি সংকেত কারণ এটি নির্বাচনী বছর বিধায় বিনিয়োগে ব্যাংকারদের আরো সতর্ক থাকতে বলেছেন অর্থমন্ত্রী নিজেই। অর্থনীতিতে এই বাড়তি তারল্য যদি অনুৎপাদন খাতে ব্যয় হয় তবে দেশে মূল্যস্ফীতি ঘটবে এবং নির্বাচন ব্যয় মেটাতে বাইরে টাকা পাচার হয়ে যাওয়ার একটা সম্ভাবনা রয়েই যাবে যা অতীতে হয়েছে। কাজেই অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে আরো বেশি হিসাব-নিকাশের বিষয় রয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে। যদিও বিগত ঘোষিত মুদ্রানীতির (জানুয়ারি-জুন) অনেক শর্তই কেন্দ্রীয় ব্যাংক মানছে না। ফলে বিনিয়োগ না বেড়ে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অতিক্রম হয়ে গেল যা অর্থনীতির জন্য সুখবর নয়। ব্যাংক যদি সঠিক সময়ে সঠিক পরিমাণ লোন উদ্যোক্তাদের হাতে তুলে দিতে পারে তবে উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধি একই সঙ্গে ত্বরান্বিত হবে এবং দেশ উন্নতির দিকে যাবে।

লেখক: ড. মিহির কুমার রায়, শিক্ষক, সিটি ইউনিভার্সিটি।

(বিনিয়োগবার্তা, ০৭ নভেম্বর ২০১৮)


Comment As:

Comment (0)