সড়কে জীবনহানী হ্রাস ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে করণীয়
মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম প্রধান: সড়কে নৈরাজ্য থেমে নেই। জাতীয় থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চলের সড়কগুলোর অবস্থা কাহিল। খানাখন্দ মুক্ত হতে পারছে না সড়কগুলো। রাজধানী ঢাকার রাস্তায় রিকশায় চড়লে শরীরের ফিজিও থেরাপির কাজ হয়ে যায়। যানচলাচলে কাঙ্ক্ষিত শৃঙ্খলা ফরে না আসায় যানজট ও দুর্ঘটনা কমছে না। বরং সড়কে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। গত এক বছরে সড়কে পাঁচ সহস্রাধিক দুর্ঘটনায় সাত সহস্রাধিক মানুষ প্রাণ হারান।
যাত্রী কল্যাণ সমিতির ‘বার্ষিক সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিবেদন- ২০১৮’ প্রকাশ উপলক্ষে সংগঠনের মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী এক লিখিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, ২০১৮ সালে ৫ হাজার ৫১৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় সারা দেশে ৭ হাজার ২২১ জন প্রাণ হারিয়েছেন। আহত হয়েছেন ১৫ হাজার ৪৬৬ জন। ২৫ জানুয়ারি জাতীয় প্রেস ক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ তথ্য তুলে ধরেন।
প্রতিবেদনে আরো জানানো হয়, গত বছরে একই সময়ে রেলপথে ৩৭০টি দুর্ঘটনায় ৩৯৪ জন নিহত হন এবং ২৪৮ জন আহত হন। অন্যদিকে নৌ-পথে ১৫৯টি দুর্ঘটনায় ১২৬ জন নিহত এবং ২৩৪ জন আহত হন এবং ৩৮৭ জন নিখোঁজ রয়েছেন। আর আকাশ পথে ৫টি দুর্ঘটনায় ৫৫ জন নিহত এবং ৩২ জন আহত হন। যাত্রী কল্যাণ সমিতির পরিসংখ্যানমতে, সড়ক, রেল, নৌ এবং আকাশপথে সম্মিলিতভাবে ৬ হাজার ৪৮টি দুর্ঘটনায় ৭ হাজার ৭৯৬ জন নিহত এবং ১৫ হাজার ৯৮০ জন আহত হয়েছেন।
সড়কগুলোয় যানবাহন চলাচলে কাঙ্ক্ষিত শৃ্খলার অভাবে সড়কে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির ঘটনা কমছে না। অসম প্রতিযোগিতা এবং লক্করঝক্কর মার্কা ফিটনেসবিহীন গাড়ি সড়কে একরকম অবাধে চলছে। অদক্ষ চালক এবং হেলফার চালকের আসনে বসায় দুর্ঘটনা বাড়ছে। টানা দীর্ঘসময় গাড়ি চালনায়ও দুর্ঘটনা বাড়ার অন্যতম কারণ।
চলন্ত অবস্থায় চালকের মোবাইল ফোন ব্যবহার, মদ্যপ অবস্থায় থাকা, বেপরোয়া ওভারটেক, যত্রতত্র গাড়ি থামিয়ে যাত্রী উঠানো, রাস্তায় মাঝখানে যাত্রী ওঠানামা, সড়কের দুর্বস্থা এবং ঘন ঘন বাঁক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। এর বাইরে নাছিমন, কমিরমন, লেগুনা, বেটারি চালিত কমগতির গাড়িগুলো মহাসড়কে চলায় দুর্ঘটনা আকরে পরিণত। ২৫ জানুয়ারি কুমিল্লায় সড়ক দুর্ঘটনায় ১৩ জন প্রাণ হারিয়েছে।খালি হয়েছে মায়ের বুক। অনেক সম্তান হারিয়েছে। স্ত্রী হারিয়েছেন স্বামী। দেশব্যাপী হারানোর বেদনা এভাবে বেড়েই চলেছে।
অতিরিক্ত লাভের আশায় সড়কে চলাচলকারী যানবাহনগুলোর মালিকপক্ষ চালক ও হেলপারদের একধরনের লিজ দেয়। অল্পসময়ে বেশি লাভের আশায় তারা বেপরোয়াগতিতে গাড়ি চালায়। এটাও দুর্ঘটনার অন্য একটি কারণ। মালিকপক্ষ যদি চালক ও হেলপারদের নিয়ম অনুযায়ী ন্যায্য পাওনা ও ছুটি ঠিকমতো দিত, তাহলে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি দুর্ঘটনা কমত, কমত প্রাণহানির ঘটনা।এতে থামত স্বজন হারানোর কান্না।
পরিসংখ্যা্ন অনুযায়ী, ২০১৮ সালে দেশব্যাপী ৫ হাজার ৫১৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় সারা দেশে ৭ হাজার ২২১ জন প্রাণ হারিয়েছেন। আহত হয়েছেন ১৫ হাজার ৪৬৬ জন । এ তথ্যগুলো ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডয়া থেকে নেওয়া। এর বাইরে দু-চারটি দুর্ঘটনায় হতাহতের ঘটনা যে ঘটেনি, তা হলফ করে বলা যাবে না। তবে সড়ক দুর্ঘটনায় যারা হতাহতের শিকার হন, তাদের বেশির ভাগই পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি।
কোনো পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তিরা সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত বা আহত হলে সে পরিবার পথে বসে বৈকি। উপার্জনক্ষম ব্যক্তির অনুপস্থিতে একটি পরিবারের অবস্থা কী হতে পারে, তা বুঝতে কারো জজ-ব্যারিস্টার হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। চারদিকে তাকালেই মনে দাগ কাটার মতো এর দুঃখজনক পরিণতি আমাদের চোখে পড়ে। বিবেককে নাড়া দেয়। পরিবারগুলো পথে বসার পরিস্থিতি কষ্ট বাড়ায়।আর আহতদের চিকিৎসার করতে গিয়ে পরিবারে দুর্দশা আরো বাড়ে। অনেকেই পঙ্গু হয়ে পরিবারের বোঝায় পরিণত হয়।
সড়ক দুর্ঘটার পর মালিকপক্ষ ইন্স্যুরেন্সের সুবিধা পেলেও যাত্রী, চা্লক আর হেলপারদের কোনো সুবিধা নেই। এতে অভিজ্ঞমহলের পক্ষ থেকে যাত্রী বীমার কথা উঠলেও দায়িত্বশীলদের টনক নড়ছে না। এটা হলে নিহত ও আহত যাত্রীদের পরিবার পথে বসা থেকে একটু হলেও রক্ষা পেত।সড়ক দুর্ঘটনা হ্রাসে সময় ও যুগোপযোগী আইন করা জরুরি। এতকিছুর পরও গত বছর যে আইনটি করা হয়েছে, সেটা চালকের মনে ভীতি সৃষ্টির ক্ষেত্রে যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন অপরাধ বিশেষজ্ঞসহ অভিজ্ঞ মহল। একটি দুর্ঘটনা সারা জীবনের কান্না, তা যেন আর না ঘটে, সে জন্য চালকদের সদাসতর্ক থাকতে কঠিন আইন প্রণোয়ন সময়ের দাবি।
লেখক: মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম প্রধান, বিশেষ প্রতিনিধি, পিএনএস।