আমাদের টাকা

ইঞ্জি. দানিয়েল মুহাম্মদ আওরঙ্গজেব: ভেবে দেখুন তো, যদি হাতে কাগুজে টাকা বা নোট না থাকতো, তবে কি করতেন? ব্যাগ ভরে সোনা/ রূপার মুদ্রা নিয়ে ঘুরতেন?

ব্যাংকিং ব্যবস্থা অতীতে একসময় ইটালিতে শুরু হলেও নোটের ব্যবহার শুরু হয় অনেক পরে। চীনের ইউয়ান সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা কুবলাই খান প্রথম কার্যকর ভাবে কাগজের তৈরী নোট চালু করেন, যা জিয়াওজি (Jiaozi) নামে পরিচিত ছিল। প্রকৃতপক্ষে কারেন্সি নোটের প্রথম প্রবর্তকের দাবিদার মূলত চীন এবং এরাই পৃথিবীর অন্যান্য অংশে মুদ্রা প্রচলনের পথকে সুগম করে।

ব্যাংকনোট (পেপার মানি বা নোট বলা হয়) এক ধরনের নেগোশিয়েবল ইন্সট্রুমেন্ট যা কোন ব্যাংক (আমাদের দেশে বাংলাদেশ ব্যাংক) বা আর্থিক কর্তৃপক্ষ কর্তৃক এই মর্মে দেয়া একটি প্রতিশ্রুতিপত্র যে, চাহিবামাত্র এর বাহককে সমমূল্য প্রদান করা হবে। জাতীয় ব্যাংকনোট সমূহ লিগ্যাল টেন্ডার  বলে বিবেচিত হয়, কেননা ফিনান্সিয়াল অবলিগেশন নিষ্পন্ন করতে সংশ্লিষ্ট আইন বা লিগ্যাল সিস্টেম এরূপ নোটকে বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে গ্রহনযোগ্যতা প্রদান করে।

বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার ১৯৭২ এর ২৩(১) ধারায় দেশে নোট ইস্যু করার একক ক্ষমতা শুধু বাংলাদেশ ব্যাংকের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে। আবার একই অর্ডারের ২৭ ধারা মোতাবেক ব্যাংক কর্তৃক ইস্যুকৃত নোটসমূহ ব্যাংকের বোর্ড কর্তৃক সুপারিশকৃত এবং সরকার কর্র্র্র্তৃক অনুমোদিত মূল্যমানভেদে ভিন্ন ভিন্ন ডিজাইন, আকার ও উপাদান দ্বারা প্রস্তুতকৃত হবে।

বর্তমানে নতুন ও পুনঃপ্রচলনযোগ্য ব্যাংক ও কারেন্সি নোটের ওপর লেখা, সীল প্রদান এবং প্যাকেটে ষ্ট্যাপলিং করা বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডিপার্টমেন্ট অব কারেন্সি এর সার্কুলার নং ০৬/২০১৯, ০৯.০৯.২০১৯ইং এর নির্দেশনা অনুযায়ী বাজারে প্রচলিত বাংলাদেশী ব্যাংক ও কারেন্সী নোটসমূহের ওপর সংখ্যা লিখন, সীল স্বাক্ষর প্রদান ও বারবার স্ট্যাপলিং করার কারনে নোটসমূহ অপেক্ষাকৃত কম সময়ে অপ্রচলনযোগ্য হয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুসন্ধানে দেখা যায় যে, টাকার উপরে লাল, নীল, কালোসহ বিভিন্ন কালিতে সংখ্যা লিখনের মাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং এ ধরনের লেখালিখিতে ব্যাংকারগণের ভূমিকাই মূখ্য। এছাড়া সকল মূল্যমানের পুনঃপ্রচলনযোগ্য নোট প্যাকেটকরনে সীল প্রদানের বিষয়টি বর্তমানে ব্যাংকিং প্র্যাকটিসে পরিনত হয়েছে। এর ফলে খুব অল্প সময়ের মধ্যে নোটসমূহ অচল ও ময়লা হয়ে যাচ্ছে এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিপত্র নং-০২/২০১৬ এর যথাযথ পলিপালন না হওয়ায় স্ট্যাপলিং এর কারনে নোটের স্থায়িত্বও কমে যাচ্ছে যা বাংলাদেশ ব্যাংকের গৃহীত ক্লিন নোট পলিসি ও নোট ব্যবস্থাপনা কৌশলের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

এ প্রসঙ্গে সেন্ট্রাল ব্যাংকের কৌশলগত পরিকল্পনার ঘোষণা, যা অবিলম্বে কার্যকর হবে তা হুবহু তুলে ধরা হলঃ

১. তফসিলি ব্যাংক কর্তৃক নতুন ও পুনঃপ্রচলনযোগ্য নোট গ্রহন, প্রদান এবং গননাকরতঃ সর্টিং ও প্যাকেটিং করার সময় নোটের উপর কোনপ্রকার সংখ্যা লিখন, অণুস্বাক্ষর প্রদান, সীল প্রদান কিংবা অন্য কোন ধরনের লেখালিখি করা যাবেনা। ডিসিএম সার্কুলার নং-০১/২০১৫ এর ১.(iii) পরিপালন নিশ্চিতকরনে নতুন ও পুনঃপ্রচলনযোগ্য নোট প্যাকেটকরনের সময় ব্যাংকের মুদ্রিত ফ্লাইলিফে ব্যাংক শাখার নাম, সীল, নোট গননাকারী ও প্রতিনিধিগণের স্বাক্ষর ও তারিখ আবশ্যিকভাবে প্রদান করতে হবে।

২. তফসিলি ব্যাংক কর্তৃক ১০০০ টাকা মূল্যমানের নোট ব্যতীত যেকোন মূল্যমানের নতুন ও পুনঃপ্রচলনযোগ্য নোটের প্যাকেটে ষ্ট্যাপলিং করা যাবেনা। মূল্যমান নির্বিশেষে (১০০০ টাকা মূল্যমানের নোট ব্যতিত) সকল নতুন ও পুনঃপ্রচলনযোগ্য নোট প্যাকেট ২৫মি.মি. হতে ৩০ মি.মি. প্রশস্ত পলিমার টেপ অথবা পলিমার যুক্ত পুরু কাগজের টিপ (Polymar Coated Paper Tape) দ্বারা ব্যান্ডিং করতে হবে। তফসিলি ব্যাংকসমূহ তাদের নোটের নিরাপত্তার স্বার্থে বিশ্বের অন্যান্য দেশে ব্যাংক নোট ব্যান্ডিং এ ব্যবহৃত আরও উন্নত প্রযুক্তির অনুসরন করতে পারে। তবে তা যেন বর্ণিত ব্যান্ডিং এর চেয়ে কার্যকর হয় তা নিশ্চিত করতে হবে। ১০০০ টাকা মূল্যমানের নোটের বিষয়ে ডিসিএম সার্কুলার নং-০২/২০১৬ এ প্রদত্ত নিদেশনা অপরিবর্তিত থাকবে।

বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর দিকে তাকালে আমরা বাংলাদেশের ঠিক উল্টো দৃশ্যটাই দেখতে পাই। যেমনঃ আমেরিকান বা কানাডিয়ান ডলার। এই মুদ্রাগুলোর উপর নেই কোন কলমের দাগ, সীল বা ছেঁড়া-ফাটা এবং এটা সম্ভব হয়েছে একমাত্র সরকারী উদ্যোগের ফলে। কারন নোটের উপর কোন প্রকার অঙ্কন আইনত নিষিদ্ধ এবং সেই নোট প্রচলনযোগ্য নয়। তাই বাংলাদেশ ব্যাংক যদি পর্যায়ক্রমে কোন প্রকার অঙ্কনকৃত টাকাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে, তবেই টাকাতে অঙ্কন বন্ধ করা সম্ভব। এতে বর্হিবিশ্বেও টাকা’র লেনদেন হবে সহজতর। ময়লা, ছেঁড়া-ফাটা নোট বদলানোর ঝামেলা ও অস্বাস্থ্যকর লেনদেন থেকে জনগন পাবে মুক্তি এবং প্রতি বছর নতুন নোট ছাপানোর জন্য বাংলাদেশ ব্যাংককেও বাড়তি খরচ করতে হবেনা। বেঁচে যাবে কোষাগারের টাকা।

লেখকঃ ইঞ্জি. দানিয়েল মুহাম্মদ আওরঙ্গজেব, মেম্বার, দি ইন্সটিটিউশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ, সিনিয়র অফিসার, ল’ডিপার্টমেন্ট, হেড অফিস, জনতা ব্যাংক লিমিটেড।

(ডিএমএ/এসএএম/ ০৯ নভেম্বর ২০১৯)


Comment As:

Comment (0)