সম্ভাবনার আরেক নাম ‘বাংলাদেশ’

অমিত হাসান নিলয়ঃ বাংলাদেশ, আমার বাংলাদেশ, অপার সম্ভাবনার বাংলাদেশ। বিশ্ব মানচিত্রে জায়গা করে নেয়া ছোট্ট একটি দেশ। সুজলা, সুফলা, শস্য শ্যামলা এই দেশের পথ চলা সেই ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বের থেকে শুরু। এক কথায় বলতে গেলে স্বাধীনতার পর ধ্বংসস্তুপ থেকেই বাংলাদেশের পথচলা শুরু হয়েছিল। স্বাধীনতার ধ্বংসাবশেষে যখন চারদিক ছাপিয়ে আছে ঠিক তখন থেকেই পাট ও চা এর মতো কয়েকটি রপ্তানিযোগ্য পণ্যে দেখিয়ে দিল সম্ভাবনার দুয়ার। সবকিছু আবার সুসংঘঠিত করে শুরু হল পথ চলা। সেই যে শুরু, এরপর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি বাংলাদেশকে।

স্বাধীনতার চার দশক পরে এসে আজ আমাদের অর্জনের তালিকা কিন্তু খুব ছোট নয় বরং রয়েছে গর্ব করার মতো অনেক অর্জন। বিশ্বের অনেক নামকরা অর্থনীতিবিদও আজ এদেশের সাফল্য দেখে বিস্মিত। গত দুই দশকের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সামাজিক উন্নয়নের যে কোনো সূচকের বিচারে বাংলাদেশের অভূতপূর্ব অগ্রগতি হয়েছে। ১৯৯০-এর পর বাংলাদেশ সার্বিকভাবে প্রবৃদ্ধিতে উন্নয়নশীল দেশের গড় হারের তুলনায় অনেক এগিয়েছে। দারিদ্র্যের হার অর্ধেক হয়ে গেছে। মেয়েদের অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে অবদানের হার দ্রুত বেড়েছে। জনসংখ্যা, গড় আয়ু, শিশুমৃত্যুর হার, মেয়েদের স্কুলে পড়ার হার, সক্ষম দম্পতিদের জন্মনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গ্রহণের হার ইত্যাদি সামাজিক সূচকে বাংলাদেশ সমপর্যায়ের উন্নয়নশীল অন্যান্য দেশ, এমনকি প্রতিবেশী ভারতকে পেছনে ফেলতে সমর্থ হয়েছে।

সত্তর দশকের প্রথম দিকে দেশে খাদ্য উৎপাদন হতো এক কোটি টন, জনসংখ্যা ছিল সাড়ে সাত কোটি। উৎপাদিত খাদ্যে ষাট ভাগ চাহিদা মিটতো, বাকি খাদ্য আমদানি করতে হতো। বিদেশি মুদ্রার মজুদ ছিল সামান্য। তাই বিদেশিদের কাছে খাদ্য সাহায্যের জন্যে নিয়মিত হাত পাততে হতো। আমাদের কৃষকের সৃজনশীলতা ও কঠোর পরিশ্রমের কারণে বাংলাদেশ বর্তমানে এক খাদ্য বিপ্লবের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের মতই কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির সংগ্রামে কৃষকেরা বিজয় অর্জন করেছেন। বাংলাদেশ এখন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। একাত্তরের তুলনায় খাদ্য উৎপাদন তিনগুণেরও বেশি বেড়েছে। গত দু’বছর ধরে বাংলাদেশ বাইরে থেকে চাল আমদানির ইতি টেনেছে। কিন্তু এ বছর দেশের উত্তরাঞ্চলে ভয়াবহ বন্যার কারনে ধান উৎপাদনে ব্যাঘাত ঘটেছে। তাই কিছু পরিমান চাল বাইরে থেকে আমদানী করতে হচ্ছে।

বিএমআই’র এক গবেষণায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশসহ ১০টি দেশ আগামী ১০ বছরে বিশ্বের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নতুন চালিকাশক্তি হয়ে উঠবে। ২০২৫ সালের মধ্যে এই ১০টি দেশ সম্মিলিতভাবে বিশ্ব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ৪ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলার যোগ করবে, যা বিনিয়োগকারীদের বড় সুযোগ এনে দেবে। উল্লেখিত অর্থ জাপানের বর্তমান অর্থনীতির সমান।
অন্য এক গবেষণায় উঠে এসেছে যে, ২০৫০ সালে বিশ্বের ২৩তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ হবে বাংলাদেশ। অর্থনৈতিকভাবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ আগামী ৩৫ বছরে কতটা শক্তিশালী হবে, তা নিয়ে গবেষণা করেছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান প্রাইস ওয়াটারহাউস কুপারস (পিডব্লিউসি)।

পিপিপির ভিত্তিতে ২০১৪ সালে বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার ৫৩ হাজার ৬০০ কোটি ডলার বা ৫৩৬ বিলিয়ন ডলার, যা বিশ্বের ৩১তম বৃহৎ অর্থনীতি। ১ হাজার ২৯১ বিলিয়ন ডলারের জিডিপি নিয়ে ২০৩০ সালে বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার হবে বিশ্বে ২৯তম। ২০৫০ সালে বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার হবে বিশ্বে ২৩তম। তখন জিডিপির আকার দাঁড়াবে ৩ হাজার ৩০০ কোটি ডলার।

স্বাধীনতার ঠিক পরেই দেশের মানুষ গড়ে বেঁচে থাকত ৪৬ বছর, এখন সেই গড় ৬৯ বছর। অথচ দক্ষিণ এশিয়ার গড় হচ্ছে ৬৫ বছর। নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে এক হাজার নবজাতকের মধ্যে মারা যায় ৭০ জন, দক্ষিণ এশিয়ায় ৫২, আর বাংলাদেশে ৩৫ জন। মেয়েরা সবচেয়ে বেশি স্কুলে যায় এই বাংলাদেশেই। বাংলাদেশ কেবল পিছিয়ে আছে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের অপুষ্টি দূর করার ক্ষেত্রে।

বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ একটি দেশ। এক সময় দেশের অতিরিক্ত জনসংখ্যাকে ‘এক নম্বর জাতীয় সমস্যা’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। কিন্তু এ জনসংখ্যা এখন আর সমস্যা নয়, বরং বিপুল সম্ভাবনার ক্ষেত্র। বাংলাদেশের জনশক্তির সবচেয়ে সম্ভাবনাময় দিক হচ্ছে এর বেশির ভাগই তরুণ। আর এই তরুণ জনশক্তি দেশের ভাগ্য পরিবর্তনে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখতে পারে। বাংলাদেশের তরুণ জনশক্তিই বিদেশে কাজ করে আয় করছে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা।

দেশের অর্থনীতিতে গার্মেন্টস শিল্পের ভূমিকা অসামান্য। সত্তরের দশকে এদেশে কিছু টেইলারিং শপ গড়ে উঠেছিল, সেখান থেকে বাংলাদেশ আজ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম গার্মেন্টস পণ্য রপ্তারিকারক দেশ। বিশ্ববাজারে পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশের অবস্থান ভারতের ওপরে, একমাত্র চীনের পরে বাংলাদেশের স্থান। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৭৫ শতাংশই আসছে এ খাত থেকে। প্রায় চল্লিশ লক্ষ শ্রমজীবী মানুষ এ পেশায় নিয়োজিত, যার প্রায় ৮০ শতাংশই নারী।

এ বিষয়গুলো থেকে খুব সহজেই বুঝা যায় যে, অদূর ভবিষ্যতে বিশ্ব অর্থনীতির প্রতিযোগিতায় ঠিক কতদুর এগিয়ে থাকবে বাংলাদেশ। বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে এগিয়ে যেতে আমাদের প্রয়োজন দল, মত, জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সবাই একসাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করা। যে কোনো উপায়ে দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। দেশটাকে নিজের ‘মা’ ভেবে লাখো শহীদের স্বপ্নমাখা ‘সোনার বাংলা’ অর্জনের পথ প্রশস্ত ও মসৃণ করা।

লেখকঃ শিক্ষার্থী, ফিনান্স বিভাগ, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস এন্ড টেকনোলজি (বিইউবিটি), শিক্ষানবিশ সাংবাদিক।

 

 


Comment As:

Comment (0)