নাবিকের সমুদ্র কথন
ক্যাপ্টেন আব্দুল্লাহ মাহমুদ: চার দিন পরে দিনটা শুরু হল ঝলমল করে। একদম ঝক ঝকে আকাশ একই সাথে তক তকে সমুদ্র। এরকম আবাহাওয়া দেখলেই যে কারো মন ভালো হয়ে যাবে, অন্তত গত চার দিনের এই আবহাওয়ার পর। কিন্তু আমাদের কারো মনই তেমন ভালো না। সবাই যার যা দায়িত্ব নিয়ে উদ্বিগ্ন। সবারই যেন শেষ মুহূর্তে মনে পড়ছে এটা করা হয় নি, এটা করলে ভালো হত, আর একটু অন্য রকম হলে ভালো হত। সবাই যার যার ভাগের নথিপত্র আবার দেখছে, কি ভুল হল, বা কি বাকি রয়ে গেল।
এমনি শনিবার হল আমাদের টেস্ট-দিবস, আজকের টেস্ট আরও ব্যাপক ভাবে করা হল। যা কয়েকদিন আগে করা হয়েছে তা আবারো করা হল, সবাই দুগুণ তিন গুনা নিশ্চিত হতে চায়। আমার সব চেয়ে বেশী চিন্তিত হবার কথা, কিন্তু আমি শুধু আমার জেরি কে নিয়ে চিন্তিত। সে মানে হচ্ছে প্রতিনিয়ত আরও কঠিন হয়ে যাচ্ছে। সে দেখাচ্ছে সে খুব স্বাভাবিক, কিন্তু আমি বুঝেছি সে তা নয়। আজকে বোট ও ফায়ার ড্রিল করার পরিকল্পনা নিলাম। চীফ ইঞ্জিনিয়ার বলছিল ইন্সপেকশনের পরে করি, আমার বক্তব্য হল আমরা নোঙরে বসে আছি, যদি মাসের ড্রিল গুলি না করা হয়, এটা আমাদের অপেশাদারিত্বের লক্ষন।
মাসের যেকোনো এক সময়ে করলেই চলে, কিন্তু সবচেয়ে ভাল সময় হল নোঙরে থাকা অবস্থায়। আজকে ফায়ার ড্রিল এর পূর্ব নির্ধারিত দৃশ্যপট হল, একোমোডেশন মানে আমাদের থাকার জায়গায় আগুন। প্রতি মাসে আমাদের এই দৃশ্যপট পরিবর্তন করা হয়। আজকের ড্রিল টি খুব সংক্ষিপ্ত করলাম, তার থেকে বেশী গুরুত্ব দিলাম ট্রেনিং এর উপর। সব ক্রু চার ভাগে ভাগ করে একেকটি গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরী ব্যবস্থার যন্ত্রপাতির উপর প্রশিক্ষণ দেয়া হল। এমন কি ব্রিজ থেকে আমার ডিউটি অফিসারকেও নীচে পাঠিয়ে দিলাম, যাতে সবার অংশগ্রহণ থাকে। জাহাজের জরুরী জেনারেটর কিভাবে চালাতে হবে, জরুরী ফায়ার পাম্প কিভাবে চালাতে হবে, জাহাজে ফোম দিয়ে অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থা কিভাবে চালাতে হবে সবাইকে দেখানো হল। শুধু দেখানো নয়, সবাইকে দিয়ে হাতে কলমে চালিয়ে দেখানো হল, যাতে জাহাজের যে কেউ জানে কিভাবে জরুরী জেনারেটরটি স্টার্ট করতে হয়, বা ফোম সিস্টেম স্টার্ট করতে হয়।
সারাদিনে দুবার ডেক রাউন্ড নিলাম। একবার ঘুরে এসে চীফ অফিসারকে তালিকা দিলাম যে এগুলি করতে হবে আজকের মধ্যেই। বিকেলে আরেকবার রাউন্ড নিয়ে নিশ্চিত হলাম যে সব কিছু করা হয়েছে। পুরো একোমোডেশনকে ধুয়ে মুছে চক চকা করা হচ্ছে শেষ বারের মত। চীফ ইঞ্জিনিয়ার ব্যস্ত তার ইঞ্জিন রুম নিয়ে। ইঞ্জিন রুমে আজকে আর যাওয়া হয় নি। কালকে প্রথম কাজ হবে ইঞ্জিন রুমে গিয়ে একবার পরিদর্শন করে আসা। আগামী দুদিন আমাদের শয়ন স্বপন জাগরণ এই ইন্সপেকশন। গতকাল পর্যন্ত খবর ছিল ১০ তারিখ ভোর পাঁচটায় পাইলট আসবে। আজকে বিকেলে শেষ বারের মত মেইল চেক করে পেলাম সেটা পিছিয়েছে, এখন সময় আগামী কাল বিকেল সাড়ে পাঁচটা এবং এটাই লাস্ট-ফাইনাল। আর কোন পরিবর্তন হবে না। সুতরাং সাথে সাথে সবাইকে এ খবর পাঠিয়ে দেয়া হল যে শেষ মুহূর্তে বার্থিং এর সময় পরিবর্তিত হয়েছে। তবে আর পরিবর্তিত হবার সম্ভাবনা নেই। আমরা যে জাহাজটির পরে যাবো তাদের কার্গো খালাস শেষ হয়ে যাবে আগামী কাল সকাল ১১টা বাজে। কিন্তু আমাদের পাইলট সাড়ে পাঁচটায়, কারন আমাদের জোয়ারের জন্য দেরী করতে হবে। তাই আগের জাহাজটি ১১টায় শেষ না করে আরও ৬-৭ ঘণ্টা দেরীতে শেষ হলেও তাতে আমাদের কিছু আসবে যাবে না।
আমাদের পাইলট সেই সাড়ে পাঁচটায় জোয়ারের সময়েই হবে। এই সময় পরিবর্তনটি আমদের জন্য ভালো হয়েছে। গত কালের সময়সূচী অনুযায়ী যদি কালে ভোর ৫টায় পাইলট হত, আমাকে উঠতে হত ২টা বাজে, এঙ্কর উঠিয়ে পাইলট যে জায়গায় উঠবে সেখানে যেতে আরও দু ঘণ্টা। তারপর জাহাজ জেটিতে বাধতে বাধতে বিকেল ২টা। মানে একটানা ১২ ঘণ্টা আমাকে ব্রিজে আটকা থাকতে হত, তারপর শুরু হয়ে যেত দাপ্তরিক কাজ, মানে কাস্টমস, ইমিগ্রেশন, অতঃপর আমাদের ইন্সপেকশন। এতে ক্লান্ত হয়ে যাব তা নয়, এসবে আমরা অভ্যস্ত, কিন্তু সমস্যা করবে ইন্সপেক্টর, সে জানতে চাইবে আমার বিশ্রাম ক’ঘণ্টা হয়েছে। আমার কাছে তার তেমন ভালো জবাব থাকবে না। কালকে সন্ধ্যা ৫:৩০ এ পাইলট হলে রাত ২টার মধ্যে জাহাজ বাধা হয়ে যাবে, আমি ঘুমাতে পারব চার পাঁচ ঘণ্টা। নূতন ভাবে আবার পরিকল্পনা করা হল, কালকে ক্রুরা কখন ছুটি করবে, কখন এঙ্কর উঠাব। এদিকে শেষ মুহূর্তে একটি অপ্রীতিকর সিদ্ধান্ত নিতে হল। সেকেন্ড অফিসার আব্দুল কে ১২-৪টা ডিউটি তে নিয়ে আসলাম আজকে রাত থেকে, জেরি কে বললাম আগামী দু দিন সে ৪-৮টা করবে। ইন্সপেকশন এর সময় জেরি কে নিয়ে আর ঝুঁকি নিতে পারলাম না। ন্যাভিগেশন ব্যাপারটি গুরুত্বপূর্ণ, এক্ষেত্রে কোন ত্রুটি খুঁজে পাক এটা আমি চাইনা।
এখনো মাসুম বাচ্চা’র মত। খুঁটি নাটি কূটনৈতিক কৌশল সে এখনো শিখে নি। সে সব প্রস্তুতি নিয়েছে, সমস্ত কোর্স আকা, সব কিছু সংশোধন করা, সবই করেছে, দিন রাত কাজ করেছে এই ইন্সপেকশনের প্রস্তুতি হিসেবে। এত খাটা খাটনি করার পরেও তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে নেয়াতে তার মন খারাপ হয়ে গেছে, কিন্তু কিছু করার নেই, আমার কাছে জাহাজের স্বার্থ আগে। বলে দিলাম ইন্সপেকশনের পর আবার সে ১২-৪টা ওয়াচ এ চলে আসবে।
অনেক পেছনে নিয়ে গেল আজকের ঘটনাটি। গ্রীসের আগুনে বিধস্থ সেই জাহাজটিকে ঠিক করার জন্য আমরা আবার গ্রীসে ফেরত গিয়েছিলাম।জ্বলে পুড়ে ছারখার হওয়া জাহাজটিকে আমরা আবার মেরামত করে নিয়ে এসেছিলাম। অধিকাংশই আগের লোকজন, আবার কিছু নূতন লোকজন মিলিয়ে জোড়া তালি দেয়া জাহাজ নিয়ে ফিরেছিলাম গ্রিস থেকে টার্কি হয়ে সুয়েজ খাল পার হয়ে চিটাগাং বন্দরে। জাহাজে থার্ড অফিসার হিসেবে ছিলেন একজন সনদ বিহীন ক্যাডেট কিন্তু সে খুবই অভিজ্ঞ লোক। আমি ক্যাডেট, ওয়াচ করি চীফ অফিসারের সাথে। জাহাজ যখন চিটাগাং পৌঁছে তখন সমস্যা হয়ে দাঁড়াল আমাদের থার্ড অফিসার। ওনার বাংলাদেশী সিডিসি বা নাবিক সনদ পত্র ছিলনা। উনি আগে পানামা সিডিসি নিয়ে বিদেশী জাহাজে চাকুরী করেছেন। বাংলাদেশ সরকার আইন করেছে বাংলাদেশী পতাকাবাহী জাহাজে কোন বিদেশী সিডিসি ধারী চাকুরী করতে পারবে না। সুতরাং তাকে সাইন অফ করে চলে যেতে হল। তখন সনদ ধারী কর্মকর্তাদের আকাল চলছে।
কেউ সনদ নিয়ে থার্ড অফিসার পদে চাকুরী করতে চাচ্ছেনা, দেশী কোম্পানি হলে সবাই সেকেন্ড অফিসারের পদ চাচ্ছে। কোম্পানি আরেকজন সিনিয়ার ক্যাডেট পাঠাল, সে প্রায় সাড়ে তিন বছর জাহাজে চাকুরী করছে, তাকে দিয়ে থার্ড অফিসারের কাজ করানো হবে। সে এর আগে আরেকটি জাহাজে কিছুদিন থার্ড অফিসার হিসেবে চাকুরী ও করেছে। কিন্তু সে আসার পর ক্যাপ্টেন তার সাথে কথা বার্তা বলে খুশী হয় নি। জাহাজ চিটাগাং সিংগাপুর নৌপথে চলাচল করবে। ক্যাপ্টেন বলে আমি সিঙ্গাপুরে একজন সনদবিহিন অফিসার নিয়ে যাব ভাল কথা কিন্তু তাকে সেই যোগ্যতা থাকতে হবে। তখন আমার সি-টাইম মানে সমুদ্রে কাজ করার অভিজ্ঞতা মাত্র মাস তিনেক, আর যিনি এসেছেন তিনি প্রায় ৪০ মাস কাজ করেছেন তার মধ্যে কয়েকমাস থার্ড অফিসার হিসেবে। ক্যাপ্টেন আমাকে ব্রিজে ডেকে নিয়ে এলেন, বললেন আমি একটি পরীক্ষা নেব। আমি ভয় পেয়ে গেলাম, কিসের পরীক্ষা নেবেন উনি! উনি বললেন, আমি একটি প্রশ্নপত্র তৈরি করেছি, তুমি আর নূতন থার্ড অফিসার আলাদা ভাবে এসব প্রশ্নের উত্তর লিখে দেবে। সে প্রশ্নপত্র আগেই তৈরি করে এনেছে। আমাদের দুজনকে নিয়ে গেল তার ক্যাবিনে, বসিয়ে দিল কাগজ কলম দিয়ে। যে প্রশ্নপত্র দিলেন তা একজন একাডেমী ক্যাডেট এর কাছে খুবই সহজ, কিন্তু আমি প্রচণ্ড ভাবে বিব্রত। একজন লোক কে অফিস থেকে থার্ড অফিসার নিয়োগ দিয়ে পাঠিয়েছে আর আমি এখানে তার সাথে প্রতিযোগিতা করছি তাকে হারানোর জন্য। তার প্রশ্ন পত্রের উত্তর দিতে আমার আধঘণ্টা লাগলো না। আমি ক্যাপ্টেন কে আমার খাতা জমা দিয়ে দিলাম, সে শুধু জিগ্যেস করল আমি সব উত্তর দিয়েছি কিনা, বললাম আমার লিখা হয়ে গিয়েছে, আমাকে ডেকে যেতে হবে, চিফ অফিসার আমাকে কাজ দিয়ে গেছে সেটা শেষ করতে হবে, একথা বলে কোন রকমে আমি পালিয়ে এলাম। আমি জানি এটা অসম প্রতিযোগিতা, একজন একাডেমী ক্যাডেটের এর সাথে তাত্ত্বিক ব্যাপারে প্রতিযোগিতা প্রহসন মাত্র।
আমার কাছে প্রশ্ন গুলো এতই সহজ যে আমি চেষ্টা করেও অকৃতকার্য হতে পারবো না, আর এই বেচারা অনেক অভিজ্ঞ, অনেক কিছুই আমার থেকে ভালো বুঝেন সন্দেহ নেই কিন্তু এসব প্রশ্ন তার কাছে দুর্বোধ্য। ঘণ্টা খানেক পর ক্যাপ্টেন বাইরে গেলেন, বলে গেলেন অফিসে যাচ্ছেন। জাহাজ তখন চিটাগাং পোর্টে, কোম্পানির অফিসও চিটাগাং। ক্যাপ্টেন প্রত্যেকদিনই সকালের দিকে একবার অফিসে যেতেন, আজকেও গেলেন। দুপুরের পর ক্যাপ্টেন ফিরে আসলেন জাহাজে, আমি ক্যাডেট, আমার ডিউটি হল চীফ অফিসারের ডিউটি। বন্দরে চীফ অফিসার সাধারণত সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত কাজ করে, আমিও তাই করি। ক্যাপ্টেন সিঁড়ি বেয়ে জাহাজে উঠার সময়েই আমার সাথে দেখা, আমার দিকে গম্ভীর ভাবে তাকিয়ে জানতে চাইলেন চীফ অফিসার কি জাহাজে? মাথা নেরে বুঝালাম সে জাহাজেই আছে। বলল চীফ অফিসারকে নিয়ে আমার ক্যাবিনে আস। সে ডাইনে বায়ে না তাকিয়ে সোজা উপরে চলে গেলেন।
দুপুরের পর চীফ অফিসার সামান্য রেস্ট নেন, ভাবিও জাহাজে, গিয়ে উঠাতে সংকোচ লাগছিল। কিন্তু ক্যাপ্টেন যেভাবে বলে গেলেন তাতে আমার গাফলতি করার সাহস ছিল না। চীফ অফিসারকে গিয়ে উঠালাম। সে তৈরি হয়ে ছুটল ক্যাপ্টেন ক্যাবিনে, পিছু পিছু আমি। গিয়ে দেখি সে পায়চারি করছে, আমাদের দেখে দাড়িয়ে গেল। চীফ অফিসার কে বলল ‘মাহমুদ এর ডিউটি অফ করে দাও’। চীফ অফিসারও তার কথা শুনে কিছু বুঝেনি কেন আমাকে অফ করে দেবে, এবং তার চেহারা দেখে বুঝা যাচ্ছে সে প্রচণ্ড খেপে আছে। তার নির্দেশের ভঙ্গিটি ছিল এমন যেন আমাকে চাকুরিচুত্য করা হচ্ছে। তখন আমি ছিলাম চীফ অফিসারের প্রধান ভরসা, জাহাজে সারেং নেই, সারেং এর কাজ আমি করতাম, ক্যাডেট এর কাজ করতাম সব মিলিয়ে আমি চীফ অফিসারের ডান হাত। ক্যাপ্টেন এর রাগত স্বরের নির্দেশে চীফ অফিসার থতমত, আর আমি কিছুই বুঝে উঠছিলাম না কি হচ্ছে।
ক্যাপ্টেন এর মনে হয় আমাদের অভিব্যক্তির দিকে কোন নজরই ছিল না, সে আপন মনে রাগে গর্জাচ্ছিল। চীফ অফিসার কোন উত্তর দিচ্ছেনা দেখে সে মনে হয় সম্বিত ফিরে পেল, এবং বুঝল তার নির্দেশ শুনলেও চীফ অফিসার নির্দেশের মানে বুঝেনি। তখন সে বলল মাহমুদ ছুটি করবে এখন, ও থার্ড অফিসারের ডিউটি করবে আজকে থেকে। আমি হা করে তাকিয়ে রইলাম। তখন চাকুরীর বাজার বেশ খারাপ, বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন আমাদের নিয়োগ দিতে পারেনি। আমরা হলাম একাডেমীর ইতিহাসের প্রথম ব্যাচ যারা সবাই পাশ করে চাকুরী পায় নি। আমাদের আগের ব্যাচ পর্যন্ত সবাই পাশ করেই শিপিং কর্পোরেশনে চাকুরী পেয়েছে। আমাদের ব্যাচে অর্ধেক শিপিং কর্পোরেশনে নেয়া হল আর বাকিদের অনেকটা জোড় করে ব্যক্তিমালিকানাধীন জাহাজ কোম্পানি গুলিতে ঢুকানো হল। তখন ব্যক্তি মালিকানাধীন কোম্পানি গুলির অবস্থা খুবই করুন। জাহাজের অবস্থা আরও করুন। তারপরেও আমি আর মুক্তাদির ভাগ্যবান কেমনে যেন একটি চাকুরী ছেড়েও আরেকটি চাকুরীও যোগার করে ফেলেছি। যে পরিস্থিতিতে ক্যাডেট এর চাকুরী পাওয়া কঠিন সেখানে আমাকে থার্ড অফিসার বানিয়ে দেয়া হল সেটা ঠিক বিশ্বাস করে উঠতে পারছিলাম না। কিন্তু ক্যাপ্টেন তখনো রাগে গজ গজ করছে, তার কারণ ও বুঝে উঠতে পারছিলাম না। আমাকে অনেকটা ধমকই দিল, যাও , দাড়িয়ে আছো কেন, গিয়ে সব কিছু অন্য ক্যাডেট কে বুঝিয়ে দাও।
আমি পরিস্থিতি সম্বন্ধে অন্ধকারে থেকেই চলে আসলাম নীচে। আমার অনেক দায়িত্ব ছিল, সব স্টোর এর চাবি আমার কাছে থাকে, জাহাজে কোন সারেং না থাকাতে সারেং এর দায়িত্বও আমাকে সামলাতে হয়, সুতরাং আমি বসে রইলাম চীফ অফিসারের অপেক্ষায়। আমাকে ধমক দিয়ে পাঠিয়ে দিলেও চীফ অফিসারকে থেকে যেতে বলেছিল ইশারায়। আরও রহস্যময় ব্যাপার ক্যাপ্টেন আমাকে থার্ড অফিসারের ডিউটি করতে বললেন কিন্তু মোটেও সন্তুষ্ট মনে হল না ব্যাপারটা তে। কিছুক্ষণ পর চীফ অফিসার নীচে আসলেন, আমাকে বললেন চাবি সব দিয়ে দাও, আমি ব্যবস্থা করছি কাকে কি ডিউটি দেব। তুমি ক্যাপ্টেন এর কাছে যাও, আবার তোমাকে ডাকছে। গেলাম আবার এক ধরনের অনিশ্চয়তা নিয়ে।
যাবার পরে বললেন, কেউ তোমার পদন্নোতির স্বপক্ষে ছিলনা, তোমাকে প্রোমোট করতে আমার অনেক যুদ্ধ করতে হয়েছে, আমি চাইনা তুমি আমার সিদ্ধান্ত ভুল প্রমাণ কর। একবারও উনি জানতে চাইলেন না আমি প্রস্তুত কিনা বা আমি পারবো কিনা। তারপর বললেন তোমাকে থার্ড অফিসারের বেতন দেয়া হবেনা, ক্যাডেটের বেতনেই তোমাকে চাকুরী করতে হবে, এতে আমার কোন সমস্যা আছে কিনা জানতে চাইলেন। আমি শুধু মাথা নাড়ালাম, কারণ আমার কাছে ব্যাপারটা এডভেঞ্চার এর মত, আমার বেতন অর্ধেক করে দিলেও আমি রাজী হতাম। পরে চীফ অফিসার শুনালেন ক্যাপ্টেন কেন এত রেগে ছিলেন। সে আমাদের পরীক্ষার খাতা নিয়ে গিয়েছিলেন অফিসে। জাহাজের মালিকদের একজন প্রাক্তন ক্যাপ্টেন। তাকে পরীক্ষার ফলাফল দেখানোর পরেও তারা বলছিল যাকে তারা পাঠিয়েছে তাকে দিয়েই চালিয়ে নিতে, কারণ তখন ব্যক্তি মালিকানাধীন কোম্পানিতে আত্মীয়, পরিচিত বা চেনা জানার মাধ্যমেই চাকুরী হত।
আমাদের চাকুরী হয়েছিল সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের চাপের মুখে। সেখানে তাদের ডিঙ্গিয়ে আমাকে পদন্নোতি দেয়া ছিল ক্যাপ্টেন এর জন্য কিছুটা উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা। ক্যাপ্টেন চূড়ান্ত ভাবে বলেছিলেন আপনারা যাকে ইচ্ছে থার্ড অফিসার বানাতে পাড়েন কিন্তু এর পরিণতির জন্য আমি দায়ী থাকব না। সবশেষে তারা ক্যাপ্টেন এর প্রস্তাবই মেনে নেয়, হয়তো বা তারা অন্তত এতটুকু বুঝে নেয় একে দিয়ে থার্ড অফিসারের কাজ করাতে পারলে অতিরিক্ত টাকা আর দিতে হবে না। সেদিন আমার জন্য ব্যাপারটি ছিল একটি অনাকাঙ্ক্ষিত পুরস্কার, কিন্তু যাকে ডিঙিয়ে ব্যাপারটি করা হয়েছিল তার জন্য ছিল বিব্রতকর। আজকে জেরি’র অভিব্যক্তি আমাকে সেই দিনের কথা স্মরণ করিয়ে দিল। কিন্তু কিছু করার নেই, যেখানে জীবন যেমন বা বলা যায় এসব জীবনেরই অংশ। এখানে আরেকটি কথা অবশ্যই বলা উচিৎ। এর আগে একটি জাহাজে আমি ১ মাস ২০ দিন ছিলাম। সে জাহাজের ক্যাপ্টেন এর সাথে কখনো কথা বলেছি বলে মনে নেই। অনেকদিন পরে তিনি আমার একটি জাহাজে সার্ভেয়ার হিসেবে এসেছিলেন, তাকে বলেছিলাম স্যার আমি আপনি আমার প্রথম ক্যাপ্টেন ছিলেন, উনি আমার চেহারাও মনে করতে পারেনি।
এর পর দ্বিতীয় জাহাজ ছিল এটি। এ জাহাজের ক্যাপ্টেনের সাথেও যে খুব বেশী কথা বলতাম তা নয়। কিন্তু উনি আমাকে অনেক কিছু শেখাতেন। আমি তার কাছ থেকে নক্ষত্র দেখা শিখি, অনেক অনেক নক্ষত্র চিনতেন, যখন ক্যাডেট হিসেবে ব্রিজে চীফ অফিসারের সাথে ওয়াচ করতাম, উনি আমাকে ব্রিজের উইংএ নিয়ে আকাসের তারা চেনাতেন, অধিকাংশই আমার এখনো মনে আছে। যেকোনো কারণে আমার উপর অস্বাভাবিক আস্থা ছিল ওনার যেটা একজন খুবই স্বল্প অভিজ্ঞতা সম্পন্ন ক্যাডেট এর উপর কেউ করবে কিনা জানিনা। একবার আমরা মাত্র জাহাজ নিয়ে সিংগাপুর বার্থিং করেছি, জাহাজটি ছিল কন্টেইনার ফিডর ভেসেল। বার্থিং এর পরপরই কার্গো ডিসচার্জ শুরু হবে। আমাদের জাহাজটি ছোট ছিল কিন্তু ডেরিক(ক্রেন) গুলি ছিল খুবই উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন। আমাদের চারটি ডেরিক ছিল সব ২৫টন উত্তোলন ক্ষমতার। কার্গো শুরু হবার আগের মুহূর্তে দেখা গেল একটি ডেরিকের তার ছিরে গেছে। আমাদের ভয়েজে থাকার সময় কখনো এটা ঘটেছে, এবং আগে কেউ এটা লক্ষ্য করেনি। তখন রাত প্রায় ১০টা।
সিঙ্গাপুরে তখন এতো রাতে বাইরের লোক এনে এটা লাগানোও সম্ভব ছিল না। জাহাজে কোন সারেং ছিল না, দুজন মাত্র সুকানি তার একজনের বয়স ছিল পঞ্চান্নর মত, ওজন হবে হয়ত ৫০ কেজি। আমি তখন থার্ড অফিসারের কাজ করি। আমাদের কাছে স্পেয়ার ওয়্যার ছিল কিন্তু লাগানোর দক্ষতা ও সরঞ্জামও ছিল না। ২৫টন ডেরিকের ওয়্যার বা তার খুবই মোটা এবং এটা ডেরিকে এই রাতের বেলা জাহাজের দু জন সুকানি দিয়ে লাগানো দুঃসাহসী ব্যাপার। ক্যাপ্টেন শুয়ে পড়েছে, যে সকালে কিছু একটা হবে। তখন মোবাইল ফোনের যুগ ছিলনা যে এজেন্ট কে ফোন করে দিল আর এজেন্ট ফোনে ফোনেই কোন ওয়ার্কশপ পাঠিয়ে দিবে। আমি চীফ অফিসারকে বললাম যে এটা আমি লাগাতে পারবো। আরও বললাম গ্রীসে যখন গ্রীক টেকনিশিয়ানরা এটা লাগায় আমি তাদের সাথে সাথে ছিলাম। যদিও আমার কাছে গ্রিকদের মত সরঞ্জাম নেই, তার পরেও মনে হয় আমি কিছু একটা ব্যবস্থা করে লাগাতে পারবো।
চীফ অফিসারের অভ্যাস ছিল কেউ আশার বানী শুনালেই সে খুশী হয়ে যেত। সে আমার উপর এই দায়িত্ব চাপিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে চলে গেলেন, আর আমি একজন মাত্র সুকানি নিয়ে এই কাজে লেগে গেলাম। রাত্র একটার দিকে ক্যাপ্টেন ক্যাবিনের জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখেছে আমি ডেকে কিছু করছি, করছি মানে সংগ্রাম করছি। এতো মোটা তারের বিরাট কয়েল কে আমি পেঁচিয়ে ফেলেছি। সেটার পেঁচ খোলানোর জন্য আমার তখন হাফ সাফ অবস্থা। ক্যাপ্টেন দেখে নীচে চলে এলো, জানতে চাইল কি করছি আমি। বললাম আমি তার পরিবর্তন করতে পারবো, আমি কৌশল টা জানি। সে কিছুক্ষণ আমার কাজ কর্ম দেখল। তারপর সে আমার সাথে কাজে লেগে গেল। রাত্র তিনটার দিকে আমি তার গুলিকে ঠিক মত গুছ গাছ করে ডেরিকে চড়িয়ে দিলাম। তখন আর তেমন কিছু করার বাকি নেই, শুধু মোটর চালিয়ে ধীরে ধীরে ড্রামে জড়িয়ে নেয়া। আমি পরিক্ষামুলক ভাবে যে পদ্ধতিটি অবলম্বন করেছিলাম সেটা বেশ ভালো ভাবে সফল হয়েছে। ক্যাপ্টেন তখন কাজ থামিয়ে বলল চীফ অফিসার কে ডাকো। চীফ অফিসার নীচে নেমে আসলো, ক্যাপ্টেন তাকে শুধু জিজ্ঞেশ করলো তুমি এই ক্যাডেটের হাতে এই কাজ দিয়ে চলে গেলে কিভাবে? চীফ অফিসার আমতা আমতা করে বলল স্যার আমিতো দেখিনি কিভাবে এটা চেঞ্জ করতে হয়, মাহমুদ দেখেছিল। ক্যাপ্টেন বলল ঠিক আছে, মাহমুদ তার কাজ করে দিয়েছে, এখন ওকে ছুটি দাও বাকিটা শুধু ড্রামে জড়িয়ে নেয়া , এটা অন্তত তুমি শেষ কর।
আমি বললাম আমি শেষ করেই যাই, সে চোখ রাঙিয়ে বলল এখন শেষ করার কিছু নেই, এটা বাচ্চা ছেলেরাও করতে পারবে এখন। এই বলে সে আমাকে সাথে নিয়ে চলে এলো ডেক থেকে। এই ভদ্রলোক এখন মনে হয় বাংলাদেশ মার্চেন্ট ম্যারিন এসোসিয়েশনের সভাপতি, ওনার নাম ক্যাপ্টেন জিল্লুর রহমান, ১১ তম ব্যাচ। এর কিছুদিন পর বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন আবার আমাদের ফিরিয়ে নেয়া শুরু করে কারণ তখন আবার ক্যাডেট স্বল্পতা দেখা দিচ্ছিল, তখন আমি সে জাহাজ থেকে সাইন অফ করে চলে আসি। উনি ভেবেছিল আমি বেতন বাড়ানোর জন্যে সাইন অফ লেটার দিয়েছি, বললেন অফিসে বলে তোমার বেতন বাড়িয়ে দিচ্ছি, কিন্তু আমার আর থাকতে ইচ্ছে হয় নি, হ্যাঁ উনি দুঃখ পেয়েছিলেন। সেটাই তার সাথে আমার শেষ দেখা। কেন জানি আর কোনদিনই তার সাথে আমার আর দেখা করা হয়ে উঠেনি, কেন জানি পেছন দিকে হাটতে একধরনের জড়তা বোধ করি। এই স্মৃতিচারণ দিয়ে শেষ করলাম আজকের লিখা।
মূল লেখা: ক্যাপ্টেন আব্দুল্লাহ মাহমুদ, সংকুলান: সুমন শামস
(ঢাকা/ ০৯ ডিসেম্বর, ২০১৭)