বীমা খাতে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা
এ কে এম এহসানুল হক: বীমার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে লিখেছেন এ কে এম এহসানুল হক। “রিস্ক ম্যানেজমেন্ট বা ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা” নিয়ে তার লেখা বিনিয়োগবার্তার পাঠকদের উদ্দেশে তুলে ধরা হলো।
জীবন এক অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে প্রবাহমান। আমরা চাই বা না চাই, জীবনের প্রতি পদে ঝুঁকি আমাদের ছায়ার মত অনুসরণ করে চলেছে। সব সময় ঝুঁকি সনাক্ত করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নাও হতে পারে। কিন্তু ঝুঁকির অস্তিত্ব অনস্বীকার্য।
জীবনে ঝুঁকি যেমন আছে তেমিন ঝুঁকির ব্যবস্থাপনাও আছে। সুষ্ঠু এবং দক্ষ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার জন্য ঝুঁকি সম্বন্ধে সম্যক জ্ঞান থাকা প্রয়োজন। ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা মূলতঃ ঝুঁকির কারণে দুর্ঘটনা সংগঠিত হওয়ার পূর্বে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ঝুঁকি এড়ানোর নীতিতে বিশ্বাসী। ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা বীমার বেলায় এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে এবং একে অপরের পরিপূরক। ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ব্যতিরেকে বীমার উন্নতি এক প্রকার অসম্ভব।
ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা প্রচলিত প্রবাদ যেমন- (১) রোগ নিরাময়ের চেয়ে রোগ নিবারণ অধিক উত্তম, (২) সময়ের এক ফোঁড় অসময়ের দশ ফোঁড় এর সমর্থনে কাজ করে।
রিস্ক ম্যানেজমেন্ট বা ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন পদ্ধতি:
বিভিন্ন পদ্ধতিতে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা করা সম্ভব। যেমন-
১। রিস্ক আইডেন্টিফিকেশন বা ঝুঁকি সনাক্তকরণ
২। রিস্ক এনালাইসিস বা ঝুঁকি বিশ্লেষণ এবং
৩। রিস্ক কন্ট্রোল বা ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ।
রিস্ক কন্ট্রোল বা ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত বিভিন্ন পদ্ধতি:
১। রিস্ক এলিমিনেশন বা ঝুঁকি নির্মূল
২। রিস্ক রিডাকশন বা ঝুঁকি হ্রাসকরণ বা ঝুঁকি উপসম
৩। রিস্ক রিটেনশন বা ঝুঁকি ধারণ
৪। রিস্ক ট্রান্সফার বা ঝুঁকি হস্তান্তর।
১। রিস্ক এলিমিনেশন বা ঝুঁকি নিমূল
ঝুঁকি নির্মূল পন্থা ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার একটি অন্যতম উপাদান। এই পদ্ধতির মাধ্যমে সমস্যার স্থায়ী সমাধান করা সম্ভব। বাস্তবে সকল ক্ষেত্রে ঝুঁকি নির্মূল করা সম্ভব নয়। এ পরিস্থিতিতে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার অন্তর্ভূক্ত অন্যান্য পদ্ধতি ব্যবহার করা যেতে পারে।
উদাহরণঃ
ক) ব্যবসা ক্ষেত্রে-
গুদাম ঘরে মাল উঠানো বা নামানোর জন্য সাধারণত ডিজেল চালিত ফর্কলিফট ব্যবহার করা হয়। কোন কারণে ডিজেল ট্যাঙ্ক থেকে ডিজেল নির্গমনের কারণে দুর্ঘটনা যেমন- আগুন বা বিষ্ফোরণ ঘটার সম্ভাবনা থাকে। ডিজেল চালিত ফর্কলিফট ব্যবহারের পরিবর্তে ব্যাটারি চালিত ফর্কলিফট ব্যবহার করলে উপরে বর্ণিত ঝুঁকিসমূহ নির্মূল করা সম্ভব হতে পারে।
খ) ব্যক্তিগত জীবনে-
বাড়িতে রান্নার কাজে অনেকে গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহার করে থাকে। গ্যাস সিলিন্ডার থেকে কোন কারণে গ্যাস নির্গমণের ফলে বিষ্ফোরণ ঘটার সম্ভাবনা থাকে। গ্যাসের পরিবর্তে বিদ্যুৎ চালিত চুলা ব্যবহার করলে বিষ্ফোরণের ঝুঁকি নির্মূল করা সম্ভব হতে পারে।
২। রিস্ক রিডাকশন বা ঝুঁকি হ্রাসকরণ-ঝুঁকি উপসম:
ঝুঁকি হ্রাস বা ঝুঁকি উপসম এ দুটি শব্দ প্রায় সমার্থক। এ দু’য়ের মধ্যে পার্থক্য খুব সামান্য। যেখানে ঝুঁকি নির্মূল সম্ভব নয় সেখানে ঝুঁকি হ্রাস বা উপসম করা যেতে পারে।
উদাহরণঃ
ক) ব্যবসাক্ষেত্রে-
অনলাইন কেনাকাটা বা বিল পরিশোধের বেলায় অধিক মূল্যের ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের পরিবর্তে অপেক্ষাকৃত কম মূল্যের ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করলে সম্ভাব্য প্রতারণার কারণে অধিক আর্থিক ক্ষতি হ্রাস করা সম্ভব হতে পারে।
খ) ব্যক্তিগত জীবনে-
রাত্রিবেলায় গাড়ি গ্যারেজে রাখা অবস্থায় বা অন্য সময় যখন গাড়ি ব্যবহৃত হয় না সেই সময় গাড়ির অগ্নিসংযোগ চাবী গাড়ি থেকে সড়িয়ে ফেলা এবং দরজা/জানালা নিরাপদভাবে বন্ধ রাখার কারণে সম্ভাব্য গাড়ি চুরির ঝুঁকি হ্রাস করা সম্ভব হতে পারে।
৩। রিস্ক রিটেনশন বা ঝুঁকি ধারণ:
ঝুঁকি ধারণ দু’ভাবে সম্ভব হতে পারে। যেমন-
ক। স্বজ্ঞানে ঝুঁকি ধারণ এবং
খ। অজ্ঞানে ঝুঁকি ধারণ
উদাহরণঃ
ক) একজন ব্যবসায়ী সন্ত্রাসী আক্রমণ দ্বারা তার সম্পত্তি ক্ষতি বা ধ্বংস হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ বিবেচনা করতে পারে এবং জেনে শুনে ঝুঁকির সম্পূর্ণ অংশ নিজেই ধারণ করার সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
খ) সম্পত্তি বীমায় বীমা গ্রহণকারী প্রিমিয়ামের উপর ছাড় পাওয়ার উদ্দেশ্যে ঝুঁকির একটি অংশ নিজে ধারণ করার সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
৪। রিস্ক ট্রান্সফার বা ঝুঁকি হস্তান্তর:
এই পদ্ধতির মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ঝুঁকি হস্তান্তর করা যেতে পারে। যেমন-
ক। বীমার মাধ্যমে ঝুঁকি হস্তান্তর এবং
খ। ইজাড়া বা ভাড়া চুক্তির মাধ্যমে ঝুঁকি হস্তান্তর ইত্যাদি।
পরিশেষে বলা যায়, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এক প্রকার নিয়মানুবর্তিতা যার মাধ্যমে ঝুঁকি পরিমাপ, ঝুঁকি নিবারণ এবং ঝুঁকি প্রতিরোধ করা সম্ভব। আমাদের মাঝে এক ধরণের ভুল ধারণা বিদ্যমান। আর সেটা হচ্ছে এই যে, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কেবলমাত্র ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কিন্তু এ ধারণা সঠিক নয়। ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা যেতে পারে। দুর্ঘটনা সংগঠিত হওয়ার আগেভাগেই দুর্ঘটনা সম্বন্ধে আমাদের সচেতন এবং সর্তক হতে হবে। দুর্ঘটনা সংগঠিত হওয়ার পর তা নিয়ে মাতম বা বিলাপ করার কোন মানে হয় না। কথায় বলে রোগীর মৃত্যুর পর ডাক্তার ডেকে কি লাভ!
লেখক: এ কে এম এহসানুল হক। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রিসহ মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেছেন। প্রায় চার দশক দুবাইয়ে অবস্থানকালে তিনি আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন বিভিন্ন বীমা কোম্পানিতে চাকরি করেছেন।
এ সময় তিনি লন্ডন থেকে ফেলো অফ দি চাটার্ড ইন্স্যুরেন্স ইন্সটিটিউট (এফসিআইআই), এসোসিয়েটস অফ দি ইন্সটিটিউট অফ রিস্ক ম্যানেজমেন্ট (এআইআরএম) এবং এসোসিয়েট অফ দি চাটার্ড ইন্সটিটিউট অফ আরবিট্রেটরস (এসিআইআরবি) ডিগ্রি অর্জন করেন।
ইন্স্যুরেন্সের ওপর এ পর্যন্ত লেখকের অনেকগুলো বই প্রকাশিত হয়েছে, যা দেশে এবং বিদেশে সমাদৃত। পেশায় লেখক একজন চাটার্ড ইন্স্যুরার। বর্তমানে তিনি সরকারী ও বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতায় নিয়োজিত।