রফতানি পণ্য বহুমুখীকরণে আরো গবেষণা ও পরিকল্পনা গ্রহণ প্রয়োজন
রেজাউল করিম খোকন: একসময় এ দেশের রফতানি বাণিজ্য পাটনির্ভর ছিল। তখন রফতানি পণ্যের তালিকা বলতে পাট, চা ও চামড়ার নাম চলে আসত। তখন রফতানি বাণিজ্য মূলত এ তিন পণ্যকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে। তবে এখন পাট রফতানিতে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে। অন্যান্য দেশ পাট উৎপাদনে নতুন বিপ্লবের সূচনা করেছে, তারা পাট ও পাটজাত পণ্য রফতানিতে অনেক এগিয়ে গেছে। বাংলাদেশ পাট রফতানিতে পিছিয়ে পড়লেও তৈরি পোশাক রফতানিতে বেশ এগিয়েছে। বিশ্বের অন্যতম সেরা গার্মেন্টসামগ্রী রফতানিকারক দেশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আমাদের রফতানি বাণিজ্যের সিংহভাগ দখল করে রেখেছে তৈরি পোশাক। শুধু গার্মেন্টের ওপর রফতানি বাণিজ্য নির্ভরশীল হয়ে ওঠাটা ক্রমেই বিপদ ডেকে আনছে অর্থনীতির জন্য। এ দেশের গামের্ন্ট শিল্প উদ্যোক্তাদের জন্য ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলেছে প্রতিকূল কিছু পরিস্থিতি। প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গে অনেক সময় কুলিয়ে ওঠা সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষ একটি কিংবা দুটি পণ্যের ওপর রফতানি বাণিজ্য নির্ভর হয়ে পড়াটাকে কোনোভাবেই পজেটিভ বলে গ্রহণ করা যায় না। যদি কোনো কারণে সংশ্লিষ্ট পণ্যটির রফতানিতে বিপর্যয় সৃষ্টি হয়, তাহলে পুরো রফতানি বাণিজ্যে চরম সংকট ঘনীভূত হতে পারে।
যখন বাংলাদেশের রফতানি বাণিজ্য পাটকেন্দ্রিক ছিল, তখন এক ধরনের সুবিধা ভোগ করত গোটা অর্থনীতি। পাটপণ্য ছিল সম্পূর্ণভাবে স্থানীয় কাঁচামালনির্ভর। ফলে এ থেকে আহরিত পুরো বৈদেশিক মুদ্রা জাতীয় অর্থনীতিতে মূল্য সংযোজন করত। কিন্তু গার্মেন্ট শিল্পের বেশির ভাগ কাঁচামাল ও মেশিনারিজ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয় মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময়ে। ফলে এ খাতে মূল্য সংযোজনের হার তুলনামূলকভাবে খুবই কম। বর্তমানে আমাদের রফতানি আয়ের ক্ষেত্রে গার্মেন্ট খাতের অবদান ৮২ দশমিক ৪৫ শতাংশ। আগামীতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক আন্তর্জাতিক বাজারে নানামুখী চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়তে যাচ্ছে। নতুন নতুন দেশ আমাদের প্রতিযোগী হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। তারা বাংলাদেশকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যেতে নতুন নতুন কৌশল অবলম্বন করছে। এতে রফতানি বাণিজ্যে নানা সংকট সৃষ্টি হয়েছে। আমাদের রফতানি বাণিজ্যে সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হচ্ছে পণ্যের বহুমুখীকরণের অভাব। পাশাপাশি বাজার সম্প্রসারণ না করে গুটিকতক দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে রফতানি বাণিজ্য। যদিও ইদানীং আমাদের রফতানি পণ্যের নতুন নতুন গন্তব্য খোঁজার চেষ্টা জোরদার হওয়ায় এক্ষেত্রে কিছুটা আশার আলো দেখা যাচ্ছে। গার্মেন্টসামগ্রীর পর চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রফতানি তালিকায় উল্লেখযোগ্য অবস্থানে রয়েছে। এখানকার কৃষিপণ্যের অনেক চাহিদা থাকলেও আন্তর্জাতিক বাজারে তা রফতানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনে বড় ধরনের সাফল্য চোখে পড়ছে না। বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প গত কয়েক দশকে বেশ এগিয়ে গেছে। বিশ্ববাজারে বাংলাদেশে তৈরি বিভিন্ন ওষুধের বেশ চাহিদা সৃষ্টি হয়েছে। এখন পৃথিবীর বহু দেশেই বাংলাদেশের ওষুধ রফতানি আরো বাড়াতে হলে নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। কৃষিপণ্য উৎপাদনে উন্নত মান বজায় রেখে বিদেশী ক্রেতাদের রুচি ও চাহিদা অনুযায়ী মোড়কজাত করে রফতানির ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
বাংলাদেশের রফতানি পণ্য বহুমুখীকরণের জন্য আরো গবেষণা ও পরিকল্পনা গ্রহণের প্রয়োজন রয়েছে। এখানে এমন অনেক সম্ভাবনা রয়েছে। এ সম্ভাবনাকে যথাযথভাবে কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক চাহিদা, রুচি ও পছন্দের বিষয়ে সজাগ হতে হবে। নির্দিষ্ট কিছু দেশের সঙ্গে রফতানি বাণিজ্য সীমাবদ্ধ রাখাটা কোনোভাবেই বুদ্ধিমানের কাজ নয়। রফতানির জন্য অপ্রচলিত পণ্য খুঁজে বের করার পাশাপাশি আমাদের রফতানি গন্তব্যের নতুন নতুন দেশ খুঁজতে হবে। এজন্য পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে আমাদের দেশে উৎপাদিত পণ্যের চাহিদা ও সম্ভাবনা খুঁজে বের করতে নানা দেশে বাংলাদেশের হাইকমিশন অফিস, দূতাবাস, কনস্যুলেট অফিস, বাণিজ্য তথ্যকেন্দ্রগুলোকে অধিকমাত্রায় মনোযোগী ও তৎপর হতে হবে।
লেখক: ব্যাংকার
(বিনিয়োগবার্তা/ ০৯ জুন ২০১৮)