বাঁচাও নদী, বাঁচাও দেশ: নূরুজ্জামান সিপন
অপরূপ এক প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের নীলাভূমির নাম `বাংলাদেশ’। সুজলা-সুফলা, শস্য-শ্যামলা আমাদের এই দেশ। প্রাকৃতিক এই সৌন্দর্য এখন ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে। দেখা দিয়েছে প্রাকৃতিক নানা বিপর্যয়, সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যখেকু কিছু দানবের ভয়ংকর থাবা। প্রাকৃতিক বিপর্যয়তো সৃষ্টিকর্তার ইশারায়ই হয়। কিন্তু প্রকৃতির বিরুদ্ধে মানুষের আগ্রাসন নিজেদেরই সৃষ্টি। এর ফলেই আজ জীবপ্রান রক্ষা ব্যবস্হা বিপন্ন। গত কয়েক দশকে এই আগ্রাসন আশ্চর্য্যজনকভাবে বেড়েছে।
হাজার হাজার বছর ধরে প্রকৃতি- নদ-নদী, মাটি, জলবায়ু, বনাঞ্চল, সূর্যালোক সকল প্রাণীর মধ্যে পারস্পারিক নির্ভরশীলতার একটি জটিল সম্পর্ক গড়ে তুলছে। যা কেবল প্রতিদিনের প্রয়োজনই মেটায় না, ভবিষৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত পৃথিবী গড়ে তুলতে সাহায্যও করে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে নিজেদের সাফল্যে অন্ধ হয়ে মানুষ ভেবেছে প্রকৃতিকে জয় করবে; স্বীয়স্বার্থে প্রকৃতিকে বাঁধাহীনভাবে ব্যবহার করতে পারবে। মূলত, প্রকৃতির বিরুদ্ধে এই যুদ্ধে মানুষ এবং অন্য সকল প্রাণী নিশ্চিত বিলুপ্তির মুখোমুখি হবে। ইতোমধ্যেই সেই ধ্বংস লীলার পূর্বাভাস দেখা দিচ্ছে। পৃথিবীর তাপমাএা বাড়ছে , এসিড-শীলাবৃষ্টি হচ্ছে, ভুমিক্ম্প, বন্যা, জলোচ্ছাস কিংবা ঘূর্ণিঝড় হচ্ছে, মরুভূমির প্রসার ঘটছে, খরা দীর্ঘতর হচ্ছে। এসবের পাশাপাশি নতুন করে জায়গা নিয়েছে বজ্রপাত। প্রতিনিয়ত পৃথিবীর কোনো না কোনো অঞ্চলে নির্মম বিনাশ চালিয়ে যাচ্ছে এসব প্রাকৃতিক দুর্যোগ। এখন সময় এসেছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে প্রান ও প্রকৃতি রক্ষায় স্হায়ী ব্যবস্হা গ্রহণের উদ্যোগী হওয়ার।
ওয়ার্ল্ড রিচার্স ইন্সটিটিউশনের মতে, বিশ্বের মোট আয়তনের ২৫% বনভূমি থাকা প্রয়োজন । কিন্তু বনভূমি উজার হতে হতে আজ সেটা অর্ধেকে এসে দাড়িয়েছে। আর একারনে বিশ্ব পরিবেশ হুমকির মুখে পড়েছে।
বাংলাদেশেও জলবায়ু পরিবর্তনের রীতিনীতি বদলে যাওয়ার ফলে একদিকে যেমন দুর্যোগের পরিমান বাড়ছে তেমনি অন্যদিকে এর ধরণও পরিবর্তন হচ্ছে। পরিবেশবারিা মনে করছেন, নির্বিচারে বৃক্ষ নিধন, কার্বন-ডাই-অক্সাইড নিসরণ, অধিকহারে শিল্প-কারখানা বৃদ্ধি ও জলাভূমি ভরাটের ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব পড়েছে এখানে।
ভৌগলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশের আর্তসামাজিক উন্নয়নের সঙ্গে নদ-নদীর একটি বিশাল ভূমিকা রয়েছে। এদেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে আসলে নদ-নদী নির্ভরতা আগে থেকেই। নদীকে ঘিরে এ অঞ্চলে জনপদ, শিল্প-বাণিজ্য সবই গড়ে উঠেছে। বিশ্বের অনেক দেশেই নদী,খাল-বিল, সাগর-মহাসাগর রয়েছে । কিন্তু নদী প্রবাহের উপর এত নির্ভরশীলতা নিয়ে গড়ে ওঠা সভ্যতা প্রথিবীব্যাপি আছে অল্পই; যা প্রাচীন কাল থেকে এ অঞ্চলে চলমান। কিন্তু বর্তমানে নানাভাবে নদ-নদীকে কলুসিত করা হচ্ছে।স্বীয় স্বার্থান্বেষী মহলের স্বার্থসিদ্ধির জন্য নদীনালা আজ বিপন্ন হতে চলেছে। যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
দু:খজনক হলেও সত্য যে, বাংলাদেশের মানচিত্র থেকে ধীরে ধীরে নদী মানচিএ উধাও হতে বসেছে আজ! দেশের অনেক জেলায়ই এখন নদ-নদী আছে কেবল কেবল বয়স্কদের স্মৃতিতে। আর এ কারণে বাস্তবে দেশের স্বাভাবিক অর্থনীতির ধারাও পাল্টে যাচ্ছে। প্রানবৈচিএ্য নি:শেষ হচ্ছে। সংস্কৃতির উৎসগুলোতেও ভাঁটা পড়েছে। বস্তুত নদীগুলো শুকিয়ে এই জনপদের ঐতিহাসিক ইকোসিস্টেম প্রায় ধ্বংসের মুখোমুখি দাড় করানো হচ্ছে। আর এ ঘটনা ঘটেছে শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ আকারে নয়, মানুষ্য সৃষ্ট ধ্বংসলীলা রূপেও।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের উপর দিয়ে প্রবাহমান নদ-নদীর রক্ষায় রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তেমন কোনো জোড়ালো ও কার্যকর উদ্যোগ চোখে পরছে না । দীর্ঘসময় ধরে দখল-দুষণসহ নানা কারণেই হারিয়ে যাচ্ছে অনেক ছোট বড় নদ-নদী। হুমকির মুখে পড়ছে জীববৈচিএ, পাল্টে যাছে নদীকেন্দ্রিক মানুষের জীবন-জীবিকা। অথচ, একসময় নদীমাতৃক বাংলাদেশের নদীকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিল রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রাচীন জনপদ।
ভৌগলিক অবস্হানগত দিক থেকে ভাটির দেশ বাংলাদেশ। উজানে ভারত, নেপাল, ভূটান, চীন খাকলেও আমাদের ভাটিতে বঙ্গপোসাগর আমাদের অভ্যন্তরীন নদীসমূহের প্রবাহের প্রধান উৎস। ভাটির দেশ হওয়ায় পানি প্রবাহের প্রায় পুরোটা আন্তর্জাতিক পানি প্রবাহের উপর নির্ভরশীল। তাই এদেশের নদী প্রবাহের প্রশ্ন এলেই প্রতিবেশী ভারতের কথা আসে। ভারত তার নিজ দেশের কৃষি, সেচ ও পানি বিদ্যুতের প্রয়োজন দেখিয়ে যেধরণের পরিকল্পনা প্রনয়ন ও বস্তবায়নের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, তা বাংলাদেশের অস্তিত্বের প্রতি মারাত্নক হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে। এ কারণে বারবার আমরা বণ্যা কিংবা খড়ায় পতিত হচ্ছি। আবার নদী ভাঙ্গনও একই কারণে হচ্ছে। তাই এ বিষয়ে আশু সমাধান একান্ত কাম্য। বিভিন্ন অজুহাতে এ বিষয়ে কালক্ষেপণ করলে ভয়াবহ হুমকিতে পড়তে পারে প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশ। তাই আগামী প্রজন্মের জন্য নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত বাংলাদেশ রেখে যেতে এখনই এ বিষয়ে জোড়ালো ভূমিকা নেওয়া উচিত।
লেখক: পরিবেশ বিশ্লেষক, সমাজকর্মী, চেয়ারম্যান (স্বপ্নপল্লী ফাউন্ডেশন)।